আজ আমি তোমাদেরকে শোনাবো আমার জীবনে দেখা প্রথম ভূত দেখার সেই রোমহর্ষক মুহুর্তটা। গল্পের চরিত্র বিষফল কৈশোর থেকে ভূত অনুসন্ধান এ মত্ত হয়। সে ছোট বেলা থেকে অতি ভয় প্রবন। তার বসত বাড়ি নির্জন মাঠের এক জঙ্গল ঘেরা পুকুর পাড়ের পাসটায়। তার বাড়ির আসে পাসে কোন বাড়ি ছিলো না। গ্রামের থেকে বিচ্ছিন্ন একটা অংশ । চতুর্দিকে ধূ ধূ মাঠ। বর্ষায় ধান গাছ চতুর্দিকে চোখে আসে তার। পূর্ণ দ্বীপ যেমন হয়। গ্রামে যেতে হতো বাঁশের সাঁকো পার হয়ে ঘন পুকুর পাড় এর পাস দিয়ে,অনেকটা গিয়ে তবেই লোকালয়।
গুম হয়ে থাকতো পুরো পরিবেশ টা সবসময়। কিছুটা দূরে পর পর ডানে বামে দুটো কবরস্থান। যে পুকুর পাড়ের পাস দিয়ে যেতে হতো, সেটার। এদিকে গ্রামের লোকজন খুব একটা প্রয়োজন ছাড়া আসতোই না। বিষফল তখনই মানুষ দেখতে পেতো কেবল। পুকুর পাড় জুড়ে সার সার নারকেল গাছ, শ্যাওড়া গাছ আর খেঁজুরগাছ, তালগাছ। রাত হলে পুরো এলাকাটায় নাকি ঝটপট শুরু হয়ে যায়। কথিত আছে পুরো এলাকাটা হাওয়া বাতাসের একচ্ছত্র দখলদার। শৈশব থেকে এমনটাই শুনে লালিত হয় মানসিকতায়। রাতের অন্ধকার যত জমাটি হয়, আমি ঘর থেকে বের হতে পারতাম না। কবরস্থান এ সাদা থান পরা লাস দেখে মনে হতো তারা বোধহয় শুয়ে থাকবে আমার সামনেটায়। যদি তারা ক্রমশ উঠে বসে আমার সামনেটায়! তীব্র শঙ্কায় রাত্রি কাটাতাম এমন। ঘরের চতুর্দিকে পুরো গাছ গাছালিতে ঘেরা। পেঁচার তীব্র চিৎকারে শিউরে শিউরে উঠতাম। মা, রান্না করতে করতে মাঝে মাঝে ছুটে আসতো, এসে বলতো পাসে বসবি চল। বাবা অনেক রাতে ফিরতো কাজ সেরে, তিনি কাপালিক-বুকো মানুষ একটা। আবার বেরিয়ে যেতো ভোরের ট্রেনে কলকাতায়।
আমি আর মা থাকতাম । ভয়ে ভয়ে। সেসময় চতুর্দিকের বিভিন্ন সব ভূতের ঘটনা শুনে শুনে তটস্থ থাকতাম। ঠিক পাসের পুকুরে একটা মাছ ঘাই দিয়ে উঠলে চমকে উঠতাম। এতটাই নিস্তব্ধতা আর ঝিঁঝি পোকার ডাক সন্ধা রাত। গ্রাম থেকে ভেসে আসতো বুক ফাটা তীব্র কুকুরের ডাক। আমরা সে সব কান পেতে শুনতাম।
কত শাঁকিনি, গুয়ে পেত্নীর গল্প শোনাতো মা আমায়। তাই বোধহয় শিরদাঁড়া সোজা রাখার প্রচেষ্টা বর্তমান জুড়ে বিষফলটার।
বর্ষায় প্রকৃতিটা কত ভয়ঙ্কর, জোনাক আলোয় ম ম। তা আমরা এমন নির্জনতায় না পৌছলে টেরই পাবো না। কাদা প্যাচ প্যাচে রাস্তা, একটু অন্য মনস্ক হলে আছাড় খাবার ভয়। সোজা কাঁটা ঝোপে নয়তো পুকুরে পুরোটা। দিনেও এ রাস্তায় লোকে আসতে ভয় পায়।
তখনকার সময় গ্রামে গরুর খোঁটা মারা ভূতের বেশ রমরমা। খটাস খটাস। সবাই খুব কান খাড়া করে শুনেছে, বুক ফুলিয়ে বলতো তা। মেছো ভূত গুয়ে পেত্নী নাকি মুখ রগড়ে মেরে দেয় কিম্বা জলে চুবিয়ে। প্রায়শই গ্রামে তখন জলে ডোবার স্মৃতি বুকটা কাঁপিয়ে দিতো আমার।
স্মৃতির গোড়ায় জল সার দিলে অনেক কথা তোড় দিয়ে ভেসে আসে সব।
আমাদের বাড়ির পুকুর পাড়ের ওপার টায় সার সার তালগাছ আর খিরিস গাছ। তার আগে পুকুরের ডানে বামে সার সার বাঁশবন পুরোটা। তখন পাড়ের এক কোনে একটা বাসক গাছ ছিলো ঠাকুরমার হাতে পোঁতা। আহ্ আরো ছিলো কত মোরগজটা ফুলগাছ। আমি সবসময় মাকে বলতাম, আমায় একদিন ভূত দেখিওতো। তখন একটু সাহসে ভর করে চলতে শেখা বলতে পারো।
মা বললো ঠিক আছে তোকে শোনাবো, রোজ নাকি একজন আসে পুকুর পারের ওপার টায়। রাত গভীর হলে। রোজ আসে। সবাই শুনেছে। তাই এটার পর ভূত নেই বলার কারো আর অবকাশ নাকি থাকবে না। আমি ক্রমশ রাত জাগা শুরু করলাম, যদি সে অভিজ্ঞতা আমার হয়।
বাবা অনেকটা রাত করে বাড়ি ফেরে, শিতের সময়। গোলগোল পশমের টুপির রমরমা ব্যবসা। সে টুপি আর চোখে পড়ে না। রাতে প্রকান্ড একটা শিমুল মাছ নিয়ে রাত কেটে কেটে ঘন কুয়াশার মধ্যে দিয়ে বাড়িতে এসে দাঁড়ায়।
মাছটার সাইজ ঠিক হাত তিনেক এর কম নয়।
মা মাছটা ল্যাম্পের আলোয় কুটিকুটি করে নেয়। তখনও গ্রামে ইলেক্ট্রিসিটি ছিলো না। সন্ধার পর মৃত্যু পুরি মনে হতো পুরো আসপাস।
মা মাছ ধুতে পুকুরে যায়, আচমকা দৌড়ে ঘরে এসে ঢোকে। বলে আয়......
দেওয়ালের ঘড়ির দিকে তাকালাম। দিব্যি মনে আছে বারোটা বাজতে দশ মিনিট ঘড়ির কাঁটায়। সেদিন অতি সাহস পেয়ে বসেছিলো আমায়। কোলাপসের গেটটা ঘড় ঘড় করে টেনে বাইরে এলাম। পিছু পিছু মা। চাঁদনি রাত। চাপচাপ অন্ধকার। বাইরে এসে কান খাড়া করলাম। কানে এলো পুকুর পারের ওপার থেকে খটাস খটাস আওযাজ। মা বললো শুনলি? আমি বললাম হ্যাঁ। ক্রমশ এগিয়ে গেলাম বাঁশ ঝাড়ের দিকটায়, পা টলা সামলে নিয়ে আরো এগোলাম। তখনও শব্দটা একটানা.......
আমার এক গ্রামের পাঠশালার মাস্টার, নাম রউপ মাস্টার। তাঁর মা বিষ খেয়ে মারা যায়, তেনার লাস পোষ্টমর্টেম করার পর পুকুর পাড়ের ওপাড়টায় রেখেছিলো। সেই থেকে নাকি ওখানে রোজ তাঁর আত্মা....
আমি এগিয়ে চললাম। মা আটকালো আমায়। তা স্বত্বেও এগিয়ে গিয়ে, সেখানে আজ একটা বড়ো খিরিস গাছ। আজ আমি দেখেই ছাড়বো, যা হয় হবে। তীব্র জেদ চেপে বসে। ভয়ে ভয়ে আর আপস নয়।
শুনলাম, তারপর যেটা দেখলাম....
ফড়ফড় করে একটা কাঠঠোকরা উড়ে গেলো পুকুরের উপর দিয়ে, আওয়াজ বন্ধ হয়। বুঝলাম এটাই ভূতের কারন। মাকে বললাম, নাহ এটা একটা কাঠঠোকরা। রোজ একটা নির্দিষ্ট সময়ে এসে গাছ থেকে ঠুকে ঠুকে পোকা খেয়ে যায়। এটা কোন খোঁটা মারার আওয়াজ নয় আত্মার। ততক্ষণে শরীর থেকে ঘাম জুড়িয়ে যায়, ঠোঁটে জয়ের হাসি ছটফট। মা শুনে অবাক। এরপর থেকে মাকে আর কোনদিন ভয় পেতে দেখলাম না। রাত বিরেতে কত পাখির খটখট ঝটপটানি গাছের পাতা নাড়িয়ে উড়ে যাওয়া স্বাভাবিক বিষয় বুঝেছিলো মা।
সেদিন ওভাবে এগিয়ে না গেলে আজও ভয়ে ভয়ে ভূত রহস্য অন্ধকারে থেকে যেতো বোধহয়। মানসে এভাবে কত ভূত রয়ে গেছে রহস্য অনুসন্ধান এর কারনে। টের পাই তা। ওসময় বুদ্ধি কাজ করে না কারো । মাকে আরো একটা ভূতের রহস্য উন্মোচন করেছিলাম। সে গল্পটা বললো অবসরে কোনদিন নিশ্চয়। আমরা ভয় জন্ম দিই, রহস্য অনুসন্ধান হীনতায়। আজ তীব্র আলোয় ভূতের কনসেপ্ট গুলো অতীত এর দোরগোড়ায়। মন যেখানে অন্ধকারে আলোহীনতায়, ভূতের অস্তিত্ব কেবলমাত্র সেথায়।
★ কলমে : বিষফল (08.11.21), 06.46P.M