আতস কাঁচ
ছিপ কড় বড়শি
★★★ ছিপ কড় বড়শি ★★★
ছিপে মাছ ধরে সে মাছ খাওয়াটার স্বাদকে বোধহয় অমৃত বলে। নয়তো অমৃতের স্বাদ মিথ্যা। যদি সেটা নিছক সোমরস জাতীয় কিছু হয়।
সবার শৈশবে কম বেশি মাছ ধরার চিরকুট অভিজ্ঞতা থাকবে না, তা হয় না।
ছিপ
কঞ্চি হোক বা বেত। কেঁচো, ছোট ব্যাঙের বাচ্চা কিম্বা ঝিঁঝি পোকা গেঁথে মাছ
তোলার তৃপ্তি সত্যি আলাদা। নিদেনপক্ষে রুটি করা আটা গুলে বড়শিতে লাগিয়ে
পুকুরে বাদাতে ফেলেছি ঢেড়। শৈশবটা মাঠের সাথে সখ্যতায় গড়ে উঠেছে। কই শোল
ল্যাটা জাপানি পুঁটি রুই মৃগেল কাতলা কখনও সখনো শিং মাগুর ফলি প্রভৃতি সব।
এখনতো
মনপিয়া বেশি ওঠে। শৈশবে মনপিয়া রুপচাঁদ পুকুরে চাষই হতো না, নতুনই মাছ
এসব। পুকুর ডুবে মাছগুলো সারা বাদায় ছড়িয়ে যায়। খালে মাছ ধরার অভিজ্ঞতা
আমার কোনকালে ছিলো না। একটা সময় খালের পরিষ্কার জলে প্রচুর বোগো মাছ চরতে
দেখতাম, খেতেও আমার দারুন লাগতো মাছটা। প্রত্যেকটা মাছের আলাদা একটা গন্ধ
থাকতো।সেটা না এলে আহ... খেয়ে মজা হতো না। বাবা হাট থেকে নিয়ে আসতো তা। আগে
গ্রামের হাটটায় কত রকম মাছ আসতো সব। তখন সেসময় কত মাছের পসরা। কত লোক হতো
হাটটায়। সপ্তাহের দুটো দিন বিকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত যেনো মেলা বসতো। কত
লোক কত আনন্দ। কত রকমের খাবার দাবারও আসতো। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম। বাবা
বাইরের খাবার খেতে দিত না। যারা কিনে খেতো সেসব, মনে হতো কত সুখি তারা।
বাবা নিয়ম করে ওই হাটে আসা নাপিতদের কাছে পাতা ইটটায় বসিয়ে দিয়ে বলতো
কদমছাঁট করে দেবে, যেনো মুঠো মেরেও ধরা যায় না। আমার খুব খারাপ লাগতো সে
সময়। যারা একটু বড় বড় চুল রাখতো, আমার খুব ভালো লাগতো তাদের চুলগুলো। হাটের
এক ধারে উঁচু মতো পুকুরের পাড়ে তিন চারজন বুড়ো বুড়ো নাপিত বসতো হাটবার
গুলোতে। আজ আর সে সব বসে না। চটকদার সব সেলুনে ছেয়ে গেছে। কত বড়বড় আয়না,
কত দামি দামি চেয়ারে বসিয়ে আজ চুল কাটে সব। কোথাও
একটা স্বাদ মিস করি
সেসব আজ না থাকায়। হয়তো সেদিন গুলোতে প্রাচুর্য ছিলো না,বড় করে চুল রাখার
পারমিশন থাকতো না। তবুও সপ্তাহের দুটো দিন আমার কাছে মেলাই মনে হোত।
চুলকাটা হয়ে গেলে ঘাড়ে পাউডার ঠুকে বলতো হয়েগেছে উঠে পড়ো খোকা। উঠে পড়তাম।
আবার মুখ লুকোবার জন্য তৈরি হতাম। বাবার হাত ধরে বাড়ি ফিরতাম।
মাঠের
মাঝখানে আমাদের একটা ঘর ছিলো সেসময় । চারিদিকে জলমগ্ন থাকতো প্রায় । আর
ধান কাটা হয়ে গেলে মনে হতো চারদিকের পুরো বাদাটা আমার। নয়তো একা একা কাটতো
সময়গুলো সব। ধান কাটার পর মাঠ শুকাতো, গ্রাম থেকে ছেলেরা আসতো পিচ করতো কেউ
বা ফুটবল। বাবাও আমায় একটা ফুটবল কিনে দিয়েছিলো। ব্যাটবল খেলতে দিতো না।
তখন সেজন্যও রাগ হতো খুব আমার। ওরা অতজন খেলে ওদের লাগবে না বল সাঁইসাঁই?
আমায় নিয়ে ওরা বড্ড বেশি চিন্তায় থাকতো। বুঝতাম। তবুও রাগ হতো আমার। চুপচাপ
কাটতো একা একা বসে জলের দিকে তাকিয়ে কেবল। লতাপাতা, গাছ, ধানের গাছ এসবই
আমার একান্ত ঘোর শৈশব। আমগাছে তেঁতুল গাছে কত না পাখির বাসা হতো। উঠে ডিম
চেক করতাম। বাচ্চা গুলোকে পেড়ে আনতাম। বাবা বকতো। মা ও। মন খারাপ হতো।
আবারও গিয়ে রেখে আসতাম।
গ্রামের কত ছেলে ময়না পাখি বাঁসা থেকে পেড়ে নিয়ে কি সুন্দর পুষতো সব। আমার সে সুযোগও কেউ দিত না।
এখন যা ইচ্ছে হয় তাই করি, কারো বাধা শুনিনা। তবে পারিনা এখন সেই ঘুঁড়ি ওড়াতে, পাখির বাচ্চা পুষতে। এসময়ে হয় না কেনো এমন সব সখ?
এখন মনে মনে ওড়াই কত রঙিন কতরকম ঘুড়ি সব। ঘুমের মধ্যে লাটাই সুতো নিয়ে খেলি, কেউ কিচ্ছু বলে না।
শিশুদের শৈশব চুরির একটা মামলা করবো সময়ই হলো না তার।
গত রবিবার ডাক এলো, এটা আর স্বপ্নে নয়।
খালে মাছ ধরতে যাবি? কত রকম বড় বড় মাছ উঠছে সব।
বললাম চল।
দুজনে গেলাম স্টেশন থেকে চার বড়শি চোঁয়া পিঁপড়ের টিপ কিনলো রজত।
রজত। ও ব্যাটার আদ্যিকালের সখ।
কোথায় যাবি আজ?
খালে ছিপ ফেলতে যাবো আজ।
সবাই কত বড় বড় মাছ ধরে নিয়ে আসছে জানিস।
ও সবার মুখে শুনে স্থির থাকতে না পেরে বললো চল।
ওর বাড়িতে খেয়ে, দুটো ছিপ নিয়ে স্কুটিতে চেপে বসলাম।
জিজ্ঞেস
করে করে দূরের একটা খালের কাছে ব্রিজের পাসে গাড়ি থামালো ও একটা সময়।
গ্রাম ছেড়ে অনেকটা দূর। কি ঘন নির্জনতা সেথায়। জলের কাছে পৌছালে বুকের
মধ্যে তোলপাড় করে মাছের সব ঘ্রান।
আহ জোর বাতাস নিলাম বুকটায়।
খালের পাসদিয়ে রাস্তা। জলে ডুবে হাঁটুজল।
বললো প্যান্ট গুটা, ও ও গুটালো হাঁটু অব্দি। জুতো খুলে হাতে সবার। আর এক হাতে কাঁধে ফেলা ছিপটা। আর একহাতে ব্যাগে চার মাছের খাবার।
টোপটা বানানোটা কম ঝক্কির নয় দেখলাম মনদিয়ে সব।
মিষ্টি
দোকান থেকে কেনা স্লাইস রুটিটা একটা মগে কুচিকুচি করতে বললো ও। দুজনে
করলাম। যেমন দেখালো করলাম। তারপর ও ঢেলে দিলো পিঁপড়ের টিপ। মাখালো।
শোঁকালো কি দারুন একটা সুবাস। তারপর একটু চার দিলো মিক্সিং প্যাক দোকান
থেকে কেনা। তারপর তাতে ঘি দিয়ে চটকে চটকে আহা কি খাসা মাছের টোপ এবার ।
ও বললো বহুজন খালে মাছ ধরতে আসবে, যার টোপটা তাদের পছন্দ হবে তার ছিপে উঠবে মাছ। মাছ ধরা অতো সহজ হয়।
মাছ আর বিলাসীনি নারী ভীষণ এক?
হাঁটুজল
টপকে ডাঁঙায় উঠলাম। সোজা খালপাড়। বহুদিন পর এত গাড় নির্জনতায়। চারদিকে
শুনশান। মাঠ আর মাঠ। ঘর বাড়ি ছাড়িয়ে শূন্যতায়। জলের ঢেউ ছুঁয়ে আসা বাতাস
আপনারা নিয়েছেন কখনও ফুসফুসটায়? তাহলে বুঝবেন না কি ঘ্রাণ সে বাতাসটায়, কি
স্বাদ।
হেঁটে চললাম। হেঁটে চললাম আরো নির্জনতায়।
এভাবে কখনও ছিপ বয়েছেন মশাই?
জলের স্রোত বড্ড সবজায়গায়। একটা গুঁড়ির কাছে এসে বসলাম। ছড়ালো ও চার।
মহাকাশ নিরবতায় দুজনে আমরা। ফিসফিস করে কথা বলবি ওর নির্দেশ ওটা।
ফাতনা নড়ে উঠলো আমার। জলের টান স্হির রাখা কি কঠিন যে হাড়ে হাড়ে টের পেলাম।
মিস
করলাম। একটা বড়ো মাছ টোপ ধরে চুপচাপ ছিলো। এমনি তুলতে গিয়ে টের পেলাম বড়
একটা মাছ খসে গেলো। আহ আফসোস। কাঁচা হাত কিনা। রজত তো পাকা শিকারী, ওর
হাতে হলে তুলে ফেলতো । প্রকান্ড।
আবার দিলাম একটা হ্যাঁচকা টান।
শালা কইমাছ। প্রথম বউনিটা আমি করলাম। ওর চোঁয়া আশাজনক নয়। শক্ত কমরেডের
মতো বার্তা, কখন মাছ লাগবে বলা যায় না। দেকি একটা বিড়ি জ্বাল।
নাহ অনেকক্ষণ কোন বড় মাছের লক্ষ্মণ আমি ধরতে পারলাম না।
ধুর, ভাল্লাগে না। একটা কই আর এক রত্তি একটা পুটি মাছ।
ওর ছিপ তখনও উপোস।
অনেকক্ষণ পর বললো চল উঠি, এখানে আজ আর মাছ লাগার সম্ভাবনা দেখছি না। আরো ভিতরের দিকটায় চল। উঠলাম।
দু
পাসে আগাছায় ঘন জঙ্গল। তার মাঝখান দিয়ে মাটির রাস্তা। মাঝেমধ্যে ইটের নজর
পড়ছে। বহুকাল আগে রাস্তা ছিলো বোধহয়। এখন নিশ্চিহ্ন সব। হাঁটতে হাঁটতে
একটা লোহার বাঁধ এর কাছে পৌছলাম। আমাদের মতো অনেকেই বসে জলের দিকে তাকিয়ে
ঠায় নিরব।
কেউ চোখে জল এনে নদী বানায়, কেউ চোখটা জলে ডুবিয়ে রাখে সারাবেলা।
ও বললো ওরা সব বড়ো বড়ো মৎস শিকারী এক একটা। বিভিন্ন কায়দায় মাছ ধরতে ওস্তাদ।
ওখানে
একা একটা বোগো মাছকে ঘোরাঘুরি করতে কতদিন পর দেখলাম। আহ কলজেটা এখানেও
জুড়ায়। ওরা নাকি ছিপে সহজে ওঠে না। কি জানি, অতসব জানা নেই আমার।
না ধরছে দেখে ছিপটা দিয়ে জোর মারলাম। ও আর উঠলোই না। মরে গেলো নাকি বেচারা?
কেঁচো
তোলা হলো। পুঁটি মাছ টোপ খেয়ে পালাচ্ছে সব। এটাই শেষ অস্ত্র। নাহ বড়ো
মাছের সন্ধান পেলাম না। আবার পুরানো জায়গায় এসে বসলাম। পাসের মাঠে পাতা
জালে একটা গোসাপ ছটকাচ্ছে দেখলাম। বেচারা আটকা পড়ে মরণাপন্ন অবস্থা। এই
গোসাপে আমার ভীষণ শিহরন জন্মায়। গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। এই একটা প্রানীকে
আমি দেখতে পারি না। গা ছমছম করে দেখলে ওটা। ছেলেবেলায় প্রাইমারি স্কুলে
পড়ার সময় পিছনে স্কুলে গিজগিজ ভাসতে দেখতাম। সঙ্গও লেগে কামড়ে ভাসতো সব। গা
রিরি করা তখন থেকে জন্মানো বোধহয়। আমার ভয় করতো।
ছোটবেলায় মা বলতো ও নাকি যাকে একবার কামড়ায় মেঘ না ডাকলে ছাড়ে না। কি জানি ভয় আরো হতো।
আজ
আটকা পড়ে দেখে কেমন মায়া জন্মায়। কতগুলো ছেলে এসে জোটে বাড়ি দিয়ে আঘাত
করতে থাকে, গোসাপটা ছটকায় জালে জড়িয়ে বেচারা। পরিনতি মৃত্যু বুঝলাম। সে মন
হোক বা জাল। নাহ আমরা আর বেশিক্ষন বসলাম না। মন ভার। উঠে হাঁটা শুরু
করলাম। দূরে একটা ডিঙি দেখতে পেলাম। মাছ ধরছে পাতা জাল ঝেড়ে। তার কাছাকাছি
তিনজন জাল ফেলতে ব্যস্ত সব। দাঁড়ালাম। মাছ ধরা দেখাও বড় তৃপ্তি কর। একজন তো
একটা খলসে আর একটা মনপিয়া তুললো। ডিঙির লোকটা একটা পাওস মাছ। রোজ এভাবে
এরা খোরাকি জোগাড় করে জানলাম।
কারো দুটো তিনতে হলে দিন চলে যায়। সে আশা
নিয়ে আসে ওরা। ব্যস্ত পৃথিবীর সমস্ত জটাজাল ভুলে থাকলাম। ফোনটা বেজে ওঠার
অপেক্ষায় ছিলাম। নাহ সারাদিন জগৎ বিচ্ছিন্ন ছিলাম।
ফেরার সময় আবাও পথ গুলিয়ে জিজ্ঞেস করে করে ফিরলাম।
পৃথিবীর
শ্রেষ্ঠ মেডিটেশন মাছ ধরা। এ শিক্ষা টা বাড়ি নিয়ে আসলাম। ওদিন কপালে মাছ
জুটলো না। আর বুক ভরা তৃপ্তিদায়ক মাছ না পাওয়ার আফশোস ও বোধহয়।
★ কলমে : বিষফল ( 04.10.21) 10.14 A.M.
কতক বসন্ত










