RSS
কবি, লেখক, সমালোচক, বাচিক শিল্পী, গল্পকার, মানবতাবাদী, নাস্তিক, যাদুকর
Showing posts with label গল্প. Show all posts
Showing posts with label গল্প. Show all posts

আতস কাঁচ


 

 

আজ আমি তোমাদেরকে শোনাবো আমার জীবনে দেখা প্রথম ভূত দেখার সেই রোমহর্ষক মুহুর্তটা। গল্পের চরিত্র বিষফল কৈশোর থেকে ভূত অনুসন্ধান এ মত্ত হয়। সে ছোট বেলা থেকে অতি ভয় প্রবন। তার বসত বাড়ি নির্জন মাঠের এক জঙ্গল ঘেরা পুকুর পাড়ের পাসটায়। তার বাড়ির আসে পাসে কোন বাড়ি ছিলো না। গ্রামের থেকে বিচ্ছিন্ন একটা অংশ । চতুর্দিকে ধূ ধূ মাঠ। বর্ষায় ধান গাছ চতুর্দিকে চোখে আসে তার। পূর্ণ দ্বীপ যেমন হয়। গ্রামে যেতে হতো বাঁশের সাঁকো পার হয়ে ঘন পুকুর পাড় এর পাস দিয়ে,অনেকটা গিয়ে তবেই লোকালয়।

গুম হয়ে থাকতো পুরো পরিবেশ টা সবসময়। কিছুটা দূরে পর পর ডানে বামে দুটো কবরস্থান। যে পুকুর পাড়ের পাস দিয়ে যেতে হতো, সেটার। এদিকে গ্রামের লোকজন খুব একটা প্রয়োজন ছাড়া আসতোই না। বিষফল তখনই মানুষ দেখতে পেতো কেবল। পুকুর পাড় জুড়ে সার সার নারকেল গাছ, শ্যাওড়া গাছ আর খেঁজুরগাছ, তালগাছ। রাত হলে পুরো এলাকাটায় নাকি ঝটপট শুরু হয়ে যায়। কথিত আছে পুরো এলাকাটা হাওয়া বাতাসের একচ্ছত্র দখলদার। শৈশব থেকে এমনটাই শুনে লালিত হয় মানসিকতায়। রাতের অন্ধকার যত জমাটি হয়, আমি ঘর থেকে বের হতে পারতাম না। কবরস্থান এ সাদা থান পরা লাস দেখে মনে হতো তারা বোধহয় শুয়ে থাকবে আমার সামনেটায়। যদি তারা ক্রমশ উঠে বসে আমার সামনেটায়! তীব্র শঙ্কায় রাত্রি কাটাতাম এমন। ঘরের চতুর্দিকে পুরো গাছ গাছালিতে ঘেরা। পেঁচার তীব্র চিৎকারে শিউরে শিউরে উঠতাম। মা, রান্না করতে করতে মাঝে মাঝে ছুটে আসতো, এসে বলতো পাসে বসবি চল। বাবা অনেক রাতে ফিরতো কাজ সেরে, তিনি কাপালিক-বুকো মানুষ একটা। আবার বেরিয়ে যেতো ভোরের ট্রেনে কলকাতায়।
আমি আর মা থাকতাম । ভয়ে ভয়ে। সেসময় চতুর্দিকের বিভিন্ন সব ভূতের ঘটনা শুনে শুনে তটস্থ থাকতাম। ঠিক পাসের পুকুরে একটা মাছ ঘাই দিয়ে উঠলে চমকে উঠতাম। এতটাই নিস্তব্ধতা আর ঝিঁঝি পোকার ডাক সন্ধা রাত। গ্রাম থেকে ভেসে আসতো বুক ফাটা তীব্র কুকুরের ডাক। আমরা সে সব কান পেতে শুনতাম।
কত শাঁকিনি, গুয়ে পেত্নীর গল্প শোনাতো মা আমায়। তাই বোধহয় শিরদাঁড়া সোজা রাখার প্রচেষ্টা বর্তমান জুড়ে বিষফলটার।

বর্ষায় প্রকৃতিটা কত ভয়ঙ্কর, জোনাক আলোয় ম ম। তা আমরা এমন নির্জনতায় না পৌছলে টেরই পাবো না। কাদা প্যাচ প্যাচে রাস্তা, একটু অন্য মনস্ক হলে আছাড় খাবার ভয়। সোজা কাঁটা ঝোপে নয়তো পুকুরে পুরোটা। দিনেও এ রাস্তায় লোকে আসতে ভয় পায়।

তখনকার সময় গ্রামে গরুর খোঁটা মারা ভূতের বেশ রমরমা। খটাস খটাস। সবাই খুব কান খাড়া করে শুনেছে, বুক ফুলিয়ে বলতো তা। মেছো ভূত গুয়ে পেত্নী নাকি মুখ রগড়ে মেরে দেয় কিম্বা জলে চুবিয়ে। প্রায়শই গ্রামে তখন জলে ডোবার স্মৃতি বুকটা কাঁপিয়ে দিতো আমার।
স্মৃতির গোড়ায় জল সার দিলে অনেক কথা তোড় দিয়ে ভেসে আসে সব।

আমাদের বাড়ির পুকুর পাড়ের ওপার টায় সার সার তালগাছ আর খিরিস গাছ। তার আগে পুকুরের ডানে বামে সার সার বাঁশবন পুরোটা। তখন পাড়ের এক কোনে একটা বাসক গাছ ছিলো ঠাকুরমার হাতে পোঁতা। আহ্ আরো ছিলো কত মোরগজটা ফুলগাছ। আমি সবসময় মাকে বলতাম, আমায় একদিন ভূত দেখিওতো। তখন একটু সাহসে ভর করে চলতে শেখা বলতে পারো।
মা বললো ঠিক আছে তোকে শোনাবো, রোজ নাকি একজন আসে পুকুর পারের ওপার টায়। রাত গভীর হলে। রোজ আসে। সবাই শুনেছে। তাই এটার পর ভূত নেই বলার কারো আর অবকাশ নাকি থাকবে না। আমি ক্রমশ রাত জাগা শুরু করলাম, যদি সে অভিজ্ঞতা আমার হয়।

বাবা অনেকটা রাত করে বাড়ি ফেরে, শিতের সময়। গোলগোল পশমের টুপির রমরমা ব্যবসা। সে টুপি আর চোখে পড়ে না। রাতে প্রকান্ড একটা শিমুল মাছ নিয়ে রাত কেটে কেটে ঘন কুয়াশার মধ্যে দিয়ে বাড়িতে এসে দাঁড়ায়।
মাছটার সাইজ ঠিক হাত তিনেক এর কম নয়।
মা মাছটা ল্যাম্পের আলোয় কুটিকুটি করে নেয়। তখনও গ্রামে ইলেক্ট্রিসিটি ছিলো না। সন্ধার পর মৃত্যু পুরি মনে হতো পুরো আসপাস।

মা মাছ ধুতে পুকুরে যায়, আচমকা দৌড়ে ঘরে এসে ঢোকে। বলে আয়......
দেওয়ালের ঘড়ির দিকে তাকালাম। দিব্যি মনে আছে বারোটা বাজতে দশ মিনিট ঘড়ির কাঁটায়। সেদিন অতি সাহস পেয়ে বসেছিলো আমায়। কোলাপসের গেটটা ঘড় ঘড় করে টেনে বাইরে এলাম। পিছু পিছু মা। চাঁদনি রাত। চাপচাপ অন্ধকার। বাইরে এসে কান খাড়া করলাম। কানে এলো পুকুর পারের ওপার থেকে খটাস খটাস আওযাজ। মা বললো শুনলি? আমি বললাম হ্যাঁ। ক্রমশ এগিয়ে গেলাম বাঁশ ঝাড়ের দিকটায়, পা টলা সামলে নিয়ে আরো এগোলাম। তখনও শব্দটা একটানা.......

আমার এক গ্রামের পাঠশালার মাস্টার, নাম রউপ মাস্টার। তাঁর মা বিষ খেয়ে মারা যায়, তেনার লাস পোষ্টমর্টেম করার পর পুকুর পাড়ের ওপাড়টায় রেখেছিলো। সেই থেকে নাকি ওখানে রোজ তাঁর আত্মা....

আমি এগিয়ে চললাম। মা আটকালো আমায়। তা স্বত্বেও এগিয়ে গিয়ে, সেখানে আজ একটা বড়ো খিরিস গাছ। আজ আমি দেখেই ছাড়বো, যা হয় হবে। তীব্র জেদ চেপে বসে। ভয়ে ভয়ে আর আপস নয়।
শুনলাম, তারপর যেটা দেখলাম....

ফড়ফড় করে একটা কাঠঠোকরা উড়ে গেলো পুকুরের উপর দিয়ে, আওয়াজ বন্ধ হয়। বুঝলাম এটাই ভূতের কারন। মাকে বললাম, নাহ এটা একটা কাঠঠোকরা। রোজ একটা নির্দিষ্ট সময়ে এসে গাছ থেকে ঠুকে ঠুকে পোকা খেয়ে যায়। এটা কোন খোঁটা মারার আওয়াজ নয় আত্মার। ততক্ষণে শরীর থেকে ঘাম জুড়িয়ে যায়, ঠোঁটে জয়ের হাসি ছটফট। মা শুনে অবাক। এরপর থেকে মাকে আর কোনদিন ভয় পেতে দেখলাম না। রাত বিরেতে কত পাখির খটখট ঝটপটানি গাছের পাতা নাড়িয়ে উড়ে যাওয়া স্বাভাবিক বিষয় বুঝেছিলো মা।
সেদিন ওভাবে এগিয়ে না গেলে আজও ভয়ে ভয়ে ভূত রহস্য অন্ধকারে থেকে যেতো বোধহয়। মানসে এভাবে কত ভূত রয়ে গেছে রহস্য অনুসন্ধান এর কারনে। টের পাই তা। ওসময় বুদ্ধি কাজ করে না কারো । মাকে আরো একটা ভূতের রহস্য উন্মোচন করেছিলাম। সে গল্পটা বললো অবসরে কোনদিন নিশ্চয়। আমরা ভয় জন্ম দিই, রহস্য অনুসন্ধান হীনতায়। আজ তীব্র আলোয় ভূতের কনসেপ্ট গুলো অতীত এর দোরগোড়ায়। মন যেখানে অন্ধকারে আলোহীনতায়, ভূতের অস্তিত্ব কেবলমাত্র সেথায়।

★ লেখা : আতস কাঁচ
★ কলমে : বিষফল (08.11.21), 06.46P.M

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

ছিপ কড় বড়শি


 


 

 ★★★ ছিপ কড় বড়শি ★★★



ছিপে মাছ ধরে সে মাছ খাওয়াটার স্বাদকে বোধহয় অমৃত বলে। নয়তো অমৃতের স্বাদ মিথ্যা। যদি সেটা নিছক সোমরস জাতীয় কিছু হয়।
সবার শৈশবে কম বেশি মাছ ধরার চিরকুট অভিজ্ঞতা থাকবে না, তা হয় না।
ছিপ কঞ্চি হোক বা বেত। কেঁচো, ছোট ব্যাঙের বাচ্চা কিম্বা ঝিঁঝি পোকা গেঁথে মাছ তোলার তৃপ্তি সত্যি আলাদা। নিদেনপক্ষে রুটি করা আটা গুলে বড়শিতে লাগিয়ে পুকুরে বাদাতে ফেলেছি ঢেড়। শৈশবটা মাঠের সাথে সখ্যতায় গড়ে উঠেছে। কই শোল ল্যাটা জাপানি পুঁটি রুই মৃগেল কাতলা কখনও সখনো শিং মাগুর ফলি প্রভৃতি সব।
এখনতো মনপিয়া বেশি ওঠে। শৈশবে মনপিয়া রুপচাঁদ পুকুরে চাষই হতো না, নতুনই মাছ এসব। পুকুর ডুবে মাছগুলো সারা বাদায় ছড়িয়ে যায়। খালে মাছ ধরার অভিজ্ঞতা আমার কোনকালে ছিলো না। একটা সময় খালের পরিষ্কার জলে প্রচুর বোগো মাছ চরতে দেখতাম, খেতেও আমার দারুন লাগতো মাছটা। প্রত্যেকটা মাছের আলাদা একটা গন্ধ থাকতো।সেটা না এলে আহ... খেয়ে মজা হতো না। বাবা হাট থেকে নিয়ে আসতো তা। আগে গ্রামের হাটটায় কত রকম মাছ আসতো সব। তখন সেসময় কত মাছের পসরা। কত লোক হতো হাটটায়। সপ্তাহের দুটো দিন বিকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত যেনো মেলা বসতো। কত লোক কত আনন্দ। কত রকমের খাবার দাবারও আসতো। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম। বাবা বাইরের খাবার খেতে দিত না। যারা কিনে খেতো সেসব, মনে হতো কত সুখি তারা। বাবা নিয়ম করে ওই হাটে আসা নাপিতদের কাছে পাতা ইটটায় বসিয়ে দিয়ে বলতো কদমছাঁট করে দেবে, যেনো মুঠো মেরেও ধরা যায় না। আমার খুব খারাপ লাগতো সে সময়। যারা একটু বড় বড় চুল রাখতো, আমার খুব ভালো লাগতো তাদের চুলগুলো। হাটের এক ধারে উঁচু মতো পুকুরের পাড়ে তিন চারজন বুড়ো বুড়ো নাপিত বসতো হাটবার গুলোতে। আজ আর সে সব বসে না। চটকদার সব সেলুনে ছেয়ে গেছে। কত বড়বড় আয়না, কত দামি দামি চেয়ারে বসিয়ে আজ চুল কাটে সব। কোথাও
একটা স্বাদ মিস করি সেসব আজ না থাকায়। হয়তো সেদিন গুলোতে প্রাচুর্য ছিলো না,বড় করে চুল রাখার পারমিশন থাকতো না। তবুও সপ্তাহের দুটো দিন আমার কাছে মেলাই মনে হোত। চুলকাটা হয়ে গেলে ঘাড়ে পাউডার ঠুকে বলতো হয়েগেছে উঠে পড়ো খোকা। উঠে পড়তাম। আবার মুখ লুকোবার জন্য তৈরি হতাম। বাবার হাত ধরে বাড়ি ফিরতাম।


মাঠের মাঝখানে আমাদের একটা ঘর ছিলো সেসময় । চারিদিকে জলমগ্ন থাকতো প্রায় । আর ধান কাটা হয়ে গেলে মনে হতো চারদিকের পুরো বাদাটা আমার। নয়তো একা একা কাটতো সময়গুলো সব। ধান কাটার পর মাঠ শুকাতো, গ্রাম থেকে ছেলেরা আসতো পিচ করতো কেউ বা ফুটবল। বাবাও আমায় একটা ফুটবল কিনে দিয়েছিলো। ব্যাটবল খেলতে দিতো না। তখন সেজন্যও রাগ হতো খুব আমার। ওরা অতজন খেলে ওদের লাগবে না বল সাঁইসাঁই? আমায় নিয়ে ওরা বড্ড বেশি চিন্তায় থাকতো। বুঝতাম। তবুও রাগ হতো আমার। চুপচাপ কাটতো একা একা বসে জলের দিকে তাকিয়ে কেবল। লতাপাতা, গাছ, ধানের গাছ এসবই আমার একান্ত ঘোর শৈশব। আমগাছে তেঁতুল গাছে কত না পাখির বাসা হতো। উঠে ডিম চেক করতাম। বাচ্চা গুলোকে পেড়ে আনতাম। বাবা বকতো। মা ও। মন খারাপ হতো। আবারও গিয়ে রেখে আসতাম।


গ্রামের কত ছেলে ময়না পাখি বাঁসা থেকে পেড়ে নিয়ে কি সুন্দর পুষতো সব। আমার সে সুযোগও কেউ দিত না।

এখন যা ইচ্ছে হয় তাই করি, কারো বাধা শুনিনা। তবে পারিনা এখন সেই ঘুঁড়ি ওড়াতে, পাখির বাচ্চা পুষতে। এসময়ে হয় না কেনো এমন সব সখ?

এখন মনে মনে ওড়াই কত রঙিন কতরকম ঘুড়ি সব। ঘুমের মধ্যে লাটাই সুতো নিয়ে খেলি, কেউ কিচ্ছু বলে না।
শিশুদের শৈশব চুরির একটা মামলা করবো সময়ই হলো না তার।


গত রবিবার ডাক এলো, এটা আর স্বপ্নে নয়।
খালে মাছ ধরতে যাবি? কত রকম বড় বড় মাছ উঠছে সব।
বললাম চল।
দুজনে গেলাম স্টেশন থেকে চার বড়শি চোঁয়া পিঁপড়ের টিপ কিনলো রজত।

রজত। ও ব্যাটার আদ্যিকালের সখ।
কোথায় যাবি আজ?
খালে ছিপ ফেলতে যাবো আজ।
সবাই কত বড় বড় মাছ ধরে নিয়ে আসছে জানিস।
ও সবার মুখে শুনে স্থির থাকতে না পেরে বললো চল।


ওর বাড়িতে খেয়ে, দুটো ছিপ নিয়ে স্কুটিতে চেপে বসলাম।

জিজ্ঞেস করে করে দূরের একটা খালের কাছে ব্রিজের পাসে গাড়ি থামালো ও একটা সময়। গ্রাম ছেড়ে অনেকটা দূর। কি ঘন নির্জনতা সেথায়। জলের কাছে পৌছালে বুকের মধ্যে তোলপাড় করে মাছের সব ঘ্রান।
আহ জোর বাতাস নিলাম বুকটায়।

খালের পাসদিয়ে রাস্তা। জলে ডুবে হাঁটুজল।
বললো প্যান্ট গুটা, ও ও গুটালো হাঁটু অব্দি। জুতো খুলে হাতে সবার। আর এক হাতে কাঁধে ফেলা ছিপটা। আর একহাতে ব্যাগে চার মাছের খাবার।


টোপটা বানানোটা কম ঝক্কির নয় দেখলাম মনদিয়ে সব।
মিষ্টি দোকান থেকে কেনা স্লাইস রুটিটা একটা মগে কুচিকুচি করতে বললো ও। দুজনে করলাম। যেমন দেখালো করলাম। তারপর ও ঢেলে দিলো পিঁপড়ের টিপ। মাখালো। শোঁকালো কি দারুন একটা সুবাস। তারপর একটু চার দিলো মিক্সিং প্যাক দোকান থেকে কেনা। তারপর তাতে ঘি দিয়ে চটকে চটকে আহা কি খাসা মাছের টোপ এবার ।
ও বললো বহুজন খালে মাছ ধরতে আসবে, যার টোপটা তাদের পছন্দ হবে তার ছিপে উঠবে মাছ। মাছ ধরা অতো সহজ হয়।

মাছ আর বিলাসীনি নারী ভীষণ এক?


হাঁটুজল টপকে ডাঁঙায় উঠলাম। সোজা খালপাড়। বহুদিন পর এত গাড় নির্জনতায়। চারদিকে শুনশান। মাঠ আর মাঠ। ঘর বাড়ি ছাড়িয়ে শূন্যতায়। জলের ঢেউ ছুঁয়ে আসা বাতাস আপনারা নিয়েছেন কখনও ফুসফুসটায়? তাহলে বুঝবেন না কি ঘ্রাণ সে বাতাসটায়, কি স্বাদ।

হেঁটে চললাম। হেঁটে চললাম আরো নির্জনতায়।

এভাবে কখনও ছিপ বয়েছেন মশাই?

জলের স্রোত বড্ড সবজায়গায়। একটা গুঁড়ির কাছে এসে বসলাম। ছড়ালো ও চার।

মহাকাশ নিরবতায় দুজনে আমরা। ফিসফিস করে কথা বলবি ওর নির্দেশ ওটা।


ফাতনা নড়ে উঠলো আমার। জলের টান স্হির রাখা কি কঠিন যে হাড়ে হাড়ে টের পেলাম।
মিস করলাম। একটা বড়ো মাছ টোপ ধরে চুপচাপ ছিলো। এমনি তুলতে গিয়ে টের পেলাম বড় একটা মাছ খসে গেলো। আহ আফসোস। কাঁচা হাত কিনা। রজত তো পাকা শিকারী, ওর হাতে হলে তুলে ফেলতো । প্রকান্ড।

আবার দিলাম একটা হ্যাঁচকা টান। শালা কইমাছ। প্রথম বউনিটা আমি করলাম। ওর চোঁয়া আশাজনক নয়। শক্ত কমরেডের মতো বার্তা, কখন মাছ লাগবে বলা যায় না। দেকি একটা বিড়ি জ্বাল।

নাহ অনেকক্ষণ কোন বড় মাছের লক্ষ্মণ আমি ধরতে পারলাম না।
ধুর, ভাল্লাগে না। একটা কই আর এক রত্তি একটা পুটি মাছ।
ওর ছিপ তখনও উপোস।
অনেকক্ষণ পর বললো চল উঠি, এখানে আজ আর মাছ লাগার সম্ভাবনা দেখছি না। আরো ভিতরের দিকটায় চল। উঠলাম।

দু পাসে আগাছায় ঘন জঙ্গল। তার মাঝখান দিয়ে মাটির রাস্তা। মাঝেমধ্যে ইটের নজর পড়ছে। বহুকাল আগে রাস্তা ছিলো বোধহয়। এখন নিশ্চিহ্ন সব। হাঁটতে হাঁটতে একটা লোহার বাঁধ এর কাছে পৌছলাম। আমাদের মতো অনেকেই বসে জলের দিকে তাকিয়ে ঠায় নিরব।

কেউ চোখে জল এনে নদী বানায়, কেউ চোখটা জলে ডুবিয়ে রাখে সারাবেলা।
ও বললো ওরা সব বড়ো বড়ো মৎস শিকারী এক একটা। বিভিন্ন কায়দায় মাছ ধরতে ওস্তাদ।

ওখানে একা একটা বোগো মাছকে ঘোরাঘুরি করতে কতদিন পর দেখলাম। আহ কলজেটা এখানেও জুড়ায়। ওরা নাকি ছিপে সহজে ওঠে না। কি জানি, অতসব জানা নেই আমার।

না ধরছে দেখে ছিপটা দিয়ে জোর মারলাম। ও আর উঠলোই না। মরে গেলো নাকি বেচারা?
কেঁচো তোলা হলো। পুঁটি মাছ টোপ খেয়ে পালাচ্ছে সব। এটাই শেষ অস্ত্র। নাহ বড়ো মাছের সন্ধান পেলাম না। আবার পুরানো জায়গায় এসে বসলাম। পাসের মাঠে পাতা জালে একটা গোসাপ ছটকাচ্ছে দেখলাম। বেচারা আটকা পড়ে মরণাপন্ন অবস্থা। এই গোসাপে আমার ভীষণ শিহরন জন্মায়। গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। এই একটা প্রানীকে আমি দেখতে পারি না। গা ছমছম করে দেখলে ওটা। ছেলেবেলায় প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় পিছনে স্কুলে গিজগিজ ভাসতে দেখতাম। সঙ্গও লেগে কামড়ে ভাসতো সব। গা রিরি করা তখন থেকে জন্মানো বোধহয়। আমার ভয় করতো।
ছোটবেলায় মা বলতো ও নাকি যাকে একবার কামড়ায় মেঘ না ডাকলে ছাড়ে না। কি জানি ভয় আরো হতো।

আজ আটকা পড়ে দেখে কেমন মায়া জন্মায়। কতগুলো ছেলে এসে জোটে বাড়ি দিয়ে আঘাত করতে থাকে, গোসাপটা ছটকায় জালে জড়িয়ে বেচারা। পরিনতি মৃত্যু বুঝলাম। সে মন হোক বা জাল। নাহ আমরা আর বেশিক্ষন বসলাম না। মন ভার। উঠে হাঁটা শুরু করলাম। দূরে একটা ডিঙি দেখতে পেলাম। মাছ ধরছে পাতা জাল ঝেড়ে। তার কাছাকাছি তিনজন জাল ফেলতে ব্যস্ত সব। দাঁড়ালাম। মাছ ধরা দেখাও বড় তৃপ্তি কর। একজন তো একটা খলসে আর একটা মনপিয়া তুললো। ডিঙির লোকটা একটা পাওস মাছ। রোজ এভাবে এরা খোরাকি জোগাড় করে জানলাম।
কারো দুটো তিনতে হলে দিন চলে যায়। সে আশা নিয়ে আসে ওরা। ব্যস্ত পৃথিবীর সমস্ত জটাজাল ভুলে থাকলাম। ফোনটা বেজে ওঠার অপেক্ষায় ছিলাম। নাহ সারাদিন জগৎ বিচ্ছিন্ন ছিলাম।

ফেরার সময় আবাও পথ গুলিয়ে জিজ্ঞেস করে করে ফিরলাম।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মেডিটেশন মাছ ধরা। এ শিক্ষা টা বাড়ি নিয়ে আসলাম। ওদিন কপালে মাছ জুটলো না। আর বুক ভরা তৃপ্তিদায়ক মাছ না পাওয়ার আফশোস ও বোধহয়।


★ কলমে : বিষফল ( 04.10.21) 10.14 A.M.






 

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

কতক বসন্ত

 





"বিষফল" তখন সদ্য মাধ্যমিক পাস করে জয়নগর ইনস্টিটিউট এর বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। বরাবরই অধ্যায়ন নিয়ে একা একা মগ্ন থাকতো সে ভীষণ। শৈশব থেকে এ যাবৎ কড়া ঘেরা টোপে বইই ছিলো তার এক মাত্র দোসর। বাবাই এনে দিতো যত রাজ্যের বইপত্র। এহেনো জীবন যাপনে তার জীবনে আরেকজন স্থান করে নেয় চরম। নিরবতার অবসান হয় ক্রমশ। কাকতালীয় ভাবে কাকলি আর বিষফল একে অপরের প্রেম হয়ে ওঠে। দুজনের জন্ম ভিন্ন ধর্মীয় পরিবারে। ছেলেটি মুসলিম পরিবারে আর মেয়েটি হিন্দু পরিবারে জন্ম গ্রহন করে । বহু প্রতিকূলতা তাদের সামনে। ভিন্ন ধর্মে বিয়ে প্রথা, বিশেষ করে গ্রামে,তখন তিব্র হিংসাজনক ঘটনা একটা।
কাকলি পড়তো জয়নগর গার্লস স্কুলে, আর বিষফল বয়েজ স্কুলে। তাদের উভয়েরই বাড়ি একই গ্রামে। বড় গ্রামের এ প্রান্ত আর ও প্রান্তে বাড়ি উভয়ের । বাসে করে স্টেশন, তারপর ট্রেনে করে স্কুল যাওয়া। এমনটা ছিলো বর্তমান স্মৃতির পথমালা। নতুন স্কুল।মাত্র কটা দিন ক্লাস করে দিব্যি বাড়ি ফিরছিলো। তখনও বিষফল অপ্রেমিক একটা।
একদা কাকলি, বিষফল আর আরেকটা ওদের পাড়ার দিদি এক সাথে ট্রেনে ওঠে। সেদিন ট্রেন থেকে ওরা নামেনি, নেমেছিলো বিষফল কেবল। পরের দুদিন পর কাকলি আবার স্কুলে আসে। স্কুল শেষে, তাদের দেখা স্টেশনে হয়। বিকাল। একটা স্টেশন পরে মথুরাপুর স্টেশন। দুজনের গন্তব্য এক। তারপর বাসে করে আবার কখনও কখনও সাইকেলে করে বাড়ি ফেরা। ওদিন জয়নগর স্টেশনে বিষফল কাকলির থেকে জানতে চায়, গত সেদিন স্কুল ড্রেস পরে সে কোথায় যায়। কাকলি স্পষ্ট উত্তর দেয় সিনেমা দেখতে যায় । স্কুলে যাবার নাম করে সিনেমা দেখতে যাবার জন্য এমনি-ই কাকলিকে বকাবকি করে বিষফল। পড়াশোনায় অষ্টরম্ভা তার উপর স্কুল কামাই করে সিনেমা দেখতে যাওয়া। তখন আচমকা কাকলি বলে.... 'আর কোনদিন যাবো না', বলে মাথা নিচু করে নেয়। তারপর কিছুক্ষন চুপচাপ। হঠাৎ মাথা তুলে চোখের দিকে তাকিয়ে মুখ চেপে হেসে বলে... 'তুই বললে যাবো, তার আগে নয়'। আবার মাথাটা নামিয়ে নেয়। মুখ টিপে হাসতে থাকে, আমি চোখ সরিয়ে নিই ওর থেকে । জানিনা কি হয়েছিলো তখন, বোঝাতে পারবোনা। চুপচাপ এক জায়গা থেকে ট্রেনে উঠেছিলাম। সেদিন ও আর লেডিস কামরার দিকে পা বাড়ালো না।
তখনও বিষফল অপ্রেমিক একটা। রসকষহীন কাঠখোট্টা। সেদিনটা বাড়ি ফেরে এভাবে ওরা দুজন । এরপর রোজ ওর টিফিন বক্স হাতড়াতাম কেনো জানি না । ওর আগে ছুটি হলে স্টেশনে এসে বসে থাকতো চুপচাপ। স্টেশনে এসে স্কুল থেকে ফেরার পথে খেতাম প্রায় । ও খেতো না, তাই বিকাল পর্যন্ত থাকতো সবটা। রেখে দিতো আমার জন্য বুঝতাম । এলে হাতে ধরিয়ে দিতো গোল টিফিন বক্স আর জলের বোতলটা । তারপর প্রায়শই টিউবওয়েলের জলে মুখ ধুতাম। ও ওর শাড়ীর আঁচল এগিয়ে দিতো, মুখ মুছতো বিষফল।
এভাবে এক সাথে আসা যাওয়া, টিফিন খাওয়া, হাসি ঠাট্টা, কারন অকারনে ওর সাথে মারপিট চলছিলো সব । অপ্রেমিক বিষফল তখনও । একজন কখন যে কার প্রেমে পড়ে, সে ক্ষন নির্নয় করা বড়া কঠিন ও সমস্যার। এদেরও তাই হয়। বাড়ি ফিরে বিষফল ভাবতে থাকে...তুই বললে যাবো। মেয়েটা তবে কি তাকে ভালোবাসে নিশ্চয়? নয়তো এভাবে কেনো বললো? একবার পরীক্ষা নেবো তা। এমনটা বিষফল মনে মনে ঠিক করে নেয়। চলছে ক্রমশ একসাথে আসা যাওয়া। চোখের ভাষা পড়তে চাইতো বিষফল। কাকলির দিকে তাকিয়ে থাকতো তখন নিরব প্রায়শই । ওর হাসিতে গুলিয়ে যেতো সব।
একদিন পরীক্ষা করার জন্য কাকলিকে এক সাথে সিনেমা দেখতে যাবার কথা বললে ও রাজি হয়। স্কুল ব্রাঙ্ক করে সোজা বারুইপুর। দুঃসাহসিক সফর তখনকার সময়। কাকলি টিকিটের টাকা দেয়। "মিলন" সিনেমা হলের নাম। প্রথম সিনেমা দেখা প্রসেনজিৎ এর "অগ্নি পরীক্ষা "। সেই সঙ্গে বিষফল-কাকলির প্রেমের পরীক্ষা শুরু হয়।
নাহ তখনও কেউ কাউকে স্পর্শ করিনি। হাতও ধরতাম না। এতটাই নিরিহ ছিলাম। বাড়ি ফিরলাম। আবার কয়েক দিন পর স্কুল ছুটি করে ডায়মন্ড হারবার। "প্রাণের স্বামী" সিনেমা চলছিলো সেদিন। সে দিন আমরা একে অপরের স্পর্শে প্রেমিক ও অবিচ্ছেদ এর পথচলা শুরু করি। ওদিন অনেক কথা বলি। ওর হাতে হাত রাখি।
হ্যাঁ কাকলি আর বিষফল এভাবে একে অপরের কাছে আসে, পথ চলে দীর্ঘ দুবছর একসাথে ওরা । ধর্ম সেখানে প্রয়োজনে আসেনি একদিনের জন্যে। ভালোবাসতে ধর্ম লাগেনা, জেনেছিলাম সেদিন আরো বেশি করে । আজ সবকিছুর উর্ধ্বে বিষফল একজন নাস্তিক জীবনযাপন করে। তার জীবনের প্রথম প্রেম কাকলি চির মর্মে ।
ওর বাড়িতে মাঝে মাঝে ওকে ইংরেজি পড়াতে যেতাম। ক্লাসে বরাবর ইংলিশে ফাস্ট বয় ছিলাম। ও ইংলিশে কাঁচা। ও ইলেভেনে আর্টস। ইংলিস কম্পালসারি সবার। সন্ধায় ওর বাড়িতে যেতাম। ও ওর বাবার থেকে পারমিশন করে নিয়েছিলো কি করে জানি না, আমায় বলেছিলো মাঝে মাঝে যেতে সন্ধায়। পড়ানোটা মিট করার বাহানা মাত্র একটা। ইংরাজি গ্রামার গুলো বোঝাতাম, ও তাকিয়ে থাকতো হাঁ। অমনোযোগী ছাত্রী একটা, হয়তো আমি শিক্ষক ছিলাম তাই অমন।
ফেরার সময় এগিয়ে দিতে বাইরে বের হতো। দুই পাড়ার মাঝে একটা প্রকান্ড সবেদা গাছ, পাসদিয়ে সরু পায়ে হাঁটা রাস্তা । গাছটা থেকে ওর বাড়ি পনেরো কুড়ি পা, ওই পর্যন্ত ও আসতো। এ পারে মুসলমান পাড়া। আমার বাড়ি একেবারে গ্রামের শেষ সিমানায়।
অন্ধকারে ঝাঁকড়া বড়ো গাছটার নিচে আরো গাড় অন্ধকার ভর করতো। সেই তিব্র অন্ধকারে ওর চোখদুটো দেখতে পেতাম না। ঠিক তখন একে অপরের হাতদুটো শক্ত করে ধরতাম। তখনই বুঝতাম ওর চোখদুটো সেই অন্ধকারেও অনেক কিছু কথা বলতে চাইতো নিরব । আমরা দুজনে চকিতে একে অপরকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ফিরতাম সজাগ। যার আয়ুষ্কাল কয়েক সেকেন্ডের বেশি দীর্ঘায়িত হতো না, পাছে পৃথিবী টের পায় । ওর বাবা আমায় খুব স্নেহ করতো। গ্রামের প্রথম বিজ্ঞানের ছাত্র। কদর করতো, আসলে স্নেহ।
একদিন না কাছে এলে মরতাম। ও ও। আজ; ও স্মৃতি কেবল। কখনও ভাবতাম না, ও কোনদিন আমার জীবন থেকে চলে যাবে বা যেতে পারে কখনও। একদিন যদি না মিট করতাম, ও সোজা আমার বাড়িতে চলে আসতো। গ্রামের সবাই সন্দেহ করতো। একটা হিন্দুর মেয়ে কেনো বাড়ি বয়ে আসে, কি জন্য। গুঞ্জন ভাসতো।
ক্রমে পড়াশোনার চাপ, টিউশন সব জয়নগরে। গ্রামে সায়েন্স এর মাস্টার ছিলো না। আসা যাওয়ায় বহু সময় নষ্ট হচ্ছিলো আমার, শরীরও ক্লান্তিতে জেরবার হচ্ছিলো সেসময়। অগত্যা মেসবাড়ি। হালদার মেসে উঠলাম। আরো মিট ঘন ঘন হলো, অগাধ স্বাধীনতায়। সিনেমা হল, নদীর পাড়। হেঁটেই চলতো সময় পার। তখন ২০০৬ সাল। বৃষ্টি, রোদ, ঝড়, জল এক সাথে অনেক কাটলো এক এক।
বক খালি আজও স্মৃতিময়। সকালে যেতাম, বালিতে হেঁটে, ঝাউবন ঘুরে দেখে, জলে পা ভিজিয়ে ভিজিয়ে চলে ক্রমশ ক্লান্ত হলে বিকালে ফিরতাম। ওর চুলের ঘ্রাণে সর্বদা মোহিত থাকতাম। আজও চোখ বন্ধ করে বাতাসে শ্বাস নিয়ে বলে দিতে পারবো ওর উপস্থিতিটা। এভাবেই চলছিলো সব। আর অন্য দিকে রাতজেগে পড়া। জয়েন্ট এন্ট্রাস এর মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ার এর প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়। ঘুমাতে যাবার আগে বইয়ের মধ্যে গুঁজে রাখা ওর ছবি দেখে তবেই ঘুমাতাম। এ খবরটা রাতারাতি মেসের সবার কানে এক এক করে পৌছে যায়।
বাবা মাঝে মধ্যে এসে দেখে যেতো আমায়, আমিও একরকম বাড়িতে যেতাম না বিশেষ কারন ছাড়া। আজও মনে পড়ে বাড়ি থেকে ফেরার সময় পিছন ফিরে তাকালে আমার মা, বোন, ছোট ভাই, বহুদিনের পরিচিত ভিটেমাটি, পুকুর, গাছপালা আমায় বোবা টানতো, ডাকতো ...... আমার চোখে জল আসতো। নিরবে চোখের জল মুছে আবার মেসে ফিরে আসতাম। জয়নগর বহুকাল আগে থেকে পৌরসভা, প্রসিদ্ধ ও কীর্তিময় একটা জায়গা।
হঠাৎ মেস বাড়ির এক দাদা আমার বাবার কাছে বইয়ে গোঁজা কাকলির ছবিটা তুলে দেয়। আমি তখন প্রেমের সাথে পথ হাঁটছিলাম। এসে শুনি সব। দু বাড়িতে জানাজানি হয়, বাবার রোষের কবলে পড়লাম । পরে শুনেছিলাম, সেদিন রাতে বাবা ওদের বাড়িতে চড়াও হয়। ফটোটা ওকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো ওটা কার? ও বলেছিলো "আমি না"। ওর বাবা ফটোটা হাতে নিয়ে মাথা নিচু করেছিলো। বাবা কড়া কড়া কথা শুনিয়ে বাড়ি ফিরেছিলো।
তারপরেও আমরা মিলতাম।
মেস জীবনের ইতি টানতে হলো সব জানা জানির পর। চলতে চলতে তখন প্রায় দু বছর।। প্রেম, নাস্তিকতার পাঠ, স্কুল লাইব্রেরির সমস্ত বই এক এক করে চষে ফেলা... দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, ধর্মগ্রন্থ, ইতিহাস, ভূগোল প্রভৃতি সব।।
দূরত্ব তৈরি হল। দু বাড়িতে যাওয়া বন্ধ হলো।
পথে টিউশনে দেখা মিলত। বেশিক্ষণ কাটানো বাম ছিলো। বকখালি গেলাম একদিন দুজন। সেদিন বালিতে বসে, চারিদিকে ঝাউবন, খুব কাঁদলাম দুজন। পরস্পর কে আঁকড়ে তখন। সমুদ্র গর্জন, প্রচন্ড বাতাসের শব্দ মুহুর্তে দুজনের কানে পৌছয়নি আদৌ। ওর মাথাটা শক্ত করে বুকের মধ্যে নিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে ছিলাম।
এর কিছুদিন পর, কাকলি আরেকটা চরিত্রের সাথে সখ্যতা বানিয়ে ফেলে। বিষফলের পিসির জা এর মেয়ে। ফতেমা। সহপাঠী। টিউশন মেট।
একদিন ওরা দুজন মেয়ে বকখালি পৌছায়। সেদিনটা ওরা বকখালিতে থেকে যায়, রাত্রি কাটায় কোন একটা বাড়িতে স্বল্প টাকায়। বাস পায়নি ওদিন ওরা। কেনো সেদিন ওরা শেষ বাসটা ধরতে দেরি করেছিলো সে রহস্য আজও অজানা। জানা হয়নি কোন ভাবে কারো থেকে, নিরব ছিলো ও বিষয়ে ফতেমা, পরে দেখা হলে । কাকলি বাড়ি ফেরে পরের দিন সোজা, আর পিসির মেয়ে বাড়ি যায়নি বকখালি থেকে ফেরার পর। ফতেমা গিয়ে উঠেছিলো অন্য একটা আত্মীয়ের বাড়িতে। বাইরে রাত কাটানোর জন্যে বাড়ি থেকে ওর দাদাদের কাছে মার খাবার ভয়ে। পরে জানলাম এসব। পিসির জা এর বাড়ি থেকে খোঁজ খবর চললে, বিষফল পৌছে যায় কাকলির বাড়িতে। ওর বোন এসে জানায়.... দিদি তোমার সাথে আর দেখা করবে না।
কি এমন হয়েছে যে কাকলি আমার সামনে মুখ দেখাতে চায় না আর? এ প্রশ্নটা আজও বিঁধতে থাকে বিষফলের বুকটায়। সমস্ত টুরিস্ট স্পট গুলো সম্বন্ধে কম বেশি খারাপ ধারনা সবার থাকে, আঁৎকে উঠতাম। কি এমন হয়েছিলো সেদিনটায়?
জড় পদার্থ ও মানুষ হয়, সেদিন হয়েছিলাম।
নাহ তারপর আর কোনদিন কাকলি সামনে আসেনি আর। সামনে পরীক্ষা এইচ. এস। স্কুল টিউশন বন্ধ সে সময়।
তখনও কারো কাছে ফোন ছিলো না।
অনেকদিন পর ফতেমার সাথে দেখা হলে জানায় কাকলি ভালো মেয়ে নয়। তুই ওকে ভালোবাসিস?
বলে... তার রাত্রি বাসটা বাথরুমে হয় সারারাত । কাকলিরটা সে জানে না, কয়েকজন ছেলের সাথে কথা বলছিলো, হাসি ঠাট্টা করছিলো নাকি শুনেছিলো এইমাত্র । এর বেশি আর কিছু সে জানায়নি আর। ছেলেগুলো কারা কোথাকার? সে প্রশ্নের উত্তর ফতেমা দিতে পারেনি আমায়। এবিষয়টা নিয়ে কথা বলতে চাইছিলো না, দেখছিলাম তার চোখে মুখে অস্বস্তির ছাপ। থেমে ছিলাম। আজও অজানা সেসব।
সন্ন্যাসীর মতো উদভ্রান্ত জীবনে প্রবেশ করলাম। অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিলো সব। ওর দূরত্বটা, ওর যোগাযোগ হীনতা, রহস্যময়তা গুলো।
তখন কারো কাছে ফোন ছিলো না।
অনেকদিন পর, ওর পাড়ার সেই দিদির থেকে কাকলির নাম্বার নিই। আমার তখন প্রথম ফোন হয়। ও জানায়... আমি যদি ওর জীবনে আসি, ও সুইসাইড করবে। ওর জীবনে নতুন একজন এসেছে, সে ওর অনেক কাছাকাছি এসেছে । আর সম্ভব নয়।
আমি নিজে থেকে ফোনটা কেটে দিয়েছিলাম। ভালো থাকুক ও। মুক্তি দিলাম, ও মুক্তি চায়।
হাহাকার নিয়ে ওকে মুক্ত করে দিয়েছিলাম এভাবে। আমার স্কুল জীবনে। ও বলতো আমাদের ছেলে হলে নাম রাখবো..... আর মেয়ে হলে নাম রাখবো......
হয়নি সত্য।।
 
 
★ লেখা : কতক বসন্ত
★ কলমে : বিষফল ( 22.08.21) 4.10 A.m.

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS