RSS
কবি, লেখক, সমালোচক, বাচিক শিল্পী, গল্পকার, মানবতাবাদী, নাস্তিক, যাদুকর

দুর্গতিনাশি


বিড়ির টকটকে আগুনে বাংলাদেশটা জ্বলছে,
আফগানিস্থানটা জ্বলছে
সমস্ত দেশ জ্বলছে।।

অতীতে যেভাবে খান্ডবটা জ্বলেছে
জতু গৃহটা জ্বলেছে।
আকাশের দিকে চোখ বুজে,
মুঠোতে ধোঁয়া টেনে নিন বুক ভরে
তাকিয়ে দেখুন আগুনে
বিড়ির টকটকে আগুনে বাংলাদেশটা জ্বলছে।

শৈশবে একবার লুকিয়ে দূর্গা প্রতিমাকে প্রনাম করেছিলাম,
বন্ধুর চোখ এড়ায় নি সেটাতে।
বলেছিলাম 'তোর মা ও আমার মা হয় রে'
বন্ধু আর কথা বলেনি সে উত্তরে।
আজ যদিও অনেক বিচার এসেছে,
বহু ভ্রমকে আমার আত্মীয় বানাতে অসুবিধা আছে।
চড়চড় করে পুড়ছে ঐশ্বরিক অহংকার
বেলপাতার মতো পুড়ছে
সদ্য ঘি মাখানো লাশের মতো পুড়ছে
চড়চড় ফটফট
যেমন পোড়ে কাঁচাকাঠ।

সেভাবে পুড়ছে গোটা পৃথিবীটা
যেভাবে ক্ষুধায় পোড়ে নাড়ি সব।

নয়নের মোমদানি যেভাবে গলে জল,
টসটস বেয়ে পড়ে চিবুকের সৈকতটায়,
সেভাবেই পুড়ছে মানুষ গোটা।

শিক্ষাগুলো বেচারা লাইব্রেরীতে বন্দি,
আসামীর তালিকায়।

হৃদয় গুলো বাঁটোয়ারা হয় পার্কের বেঞ্চিতে সার সার,
বেশিরভাগ দূরত্বের সম্পর্কের আয়ু টেনেটুনে ছ মাস
তারপর পড়ে থাকে মেশিন থেকে নিগড়ানো আখের ছিবড়া যেমন হয়।
কথার ফুলঝুরি চরকি ধর্মগ্রন্থ ময়,
প্রেমিক প্রেমিকার বুলিতে আজ।

ঝড় গুলো সব হৃদয়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে,
আমার একটাও আত্মীয় মৃত্যু আর নয়।

গোটা বিশ্বটা আমার আত্মীয়তা চেয়েছে...

অপরাধী গুলোকে লাইব্রেরীর চার দেওয়ালে পুরে দিয়েছি,
আমি কথা দিয়েছি
শান্ত করবো পৃথিবী।


★ লেখা : দুর্গতিনাশি
★ কলমে : বিষফল (19.10.21), 11.56 P.M.


 

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

কা কা...


 

 

 
 
 
দেশের পিরিয়ডস চলছে, স্যানিটারি ন্যাপকিন দরকার।
ছোপছোপ থোকা থোকা রক্তের দাগ,
সবার হাতে পায়
কটু গন্ধে ম ম ব্লাড ব্যাঙ্ক।
তুলো গজ নিন মানসিকতায়,
বন্ধ করুন রক্ত ক্ষরন সব।
পিঠে শিরদাঁড়ায় ব্যথা,
তলপেটে আর খামচে ধোরো না মায়ায়।
পিঠের বালিশে তুলোর অস্তিত্ব কম মনে হয় আজ,
সেজদাতে কপাল ঠেকাই ভুল ঈশ্বরমালায়।
দেশের পিরিয়ডস চলছে, স্যানিটারি ন্যাপকিন দরকার।
মমির বুকে ড্রিল করে তার হৃদপিণ্ডের রক্তপান করলাম।
কান পেতে শুনে ফিরলাম,
একটা মানব সভ্যতার মিউজিয়াম।
কবির শেষ ঠোঁট ছোঁয়া ভাঙা একটা কাপ
আর,
দাঁত দিয়ে ছিন্নভিন্ন ঈশ্বরীর যোনী গোটাকয়।
উজ্জ্বল ফ্লাশের আলোয় তীব্র গভীর কবর খুঁড়ে শুয়ে পড়লাম,
পাসে সাজিয়ে দাও ধর্মগ্রন্থ সব।
নিন....
ওসবের ঘ্রাণে আমার পঞ্চভূত চাইলেম।
অথচ, আপনার নেশায় চোখ লাল,
বুদ্ধি ঝিমিয়ে পতিতা।
ভাড়া খাটার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে আজ,
শরীরে স্বল্পবাস, মুখময় লালার আস্তরন মোটা।
নাহ, আমি আর ঘ্রাণ নিতে পারছি না।
রক্ত বারুদ কান্নার কি থকথক সহবাস।
চাঁদের বুড়ি গাছের তলায় কবে মরে গেলো?
জানেন আপনারা?
দেশের পিরিয়ডস চলছে, স্যানিটারি ন্যাপকিন দরকার।
আপনারা রোজ একবার পোষাকহীন সমুদ্রের কিনারায় এসে দাঁড়ান।
একা, ভীষণ একা....
গাঢ় কুয়াশায়, কিম্বা রাত্রি যখন ফুলসজ্জায় ধীর পায়।
আপনার ফুসফুসটা নিংড়ে ধুয়ে আসুন.....
পাখির সাথে চিৎকার করে উঠুন কা কা.....
 
 
★ লেখা : কা কা...
★ কলমে : বিষফল (19.10.21), 11.47 A.M.

 

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

প্রগলভতা


 



মুক্তের চাষ করেছি মনের ভিতরে।
তুলবেন?
শামুকখোল থেকে বাঁচিয়ে রেখেছি রোজ।
মাছরাঙা হয়ে জন্ম নিন আবার,
আমি অপেক্ষায় থাকবো তার।
সম্পর্কের ভুল নাম দেবো না আর,
অনেক সূর্যাস্ত দেখলাম।
ক্রমে সমস্ত জমিতে শাপলা তুলে ঝিনুক ভরলাম।
টার্ম, কন্ডিশন, জীবনটাই ঘুরপাক।
ক্ষনিক গুলো আজ সব কচুপাতায় জল।
সামান্য বাতাসেও টলে ওঠে আজ,
কথার ফুলঝুরি টাই মায়া।
একটা চক চাই আমার...
আর একটা ডাস্টার।।
মস্তিষ্কের ঘিলুগুলো বের করে দিতে চাই এবার।
দাঙ্গায় দিনপাত করে আমার এই সমাজ।
রক্ত, আগুন....
চিতাকাঠ দিয়ে একে ওপরকে ঠান্ডা করতে ব্যস্ত আজ।
বৃষ্টির মধ্যে ঘ্রাণ নেবার সবার সময় কোথায়!
তুলতুলে মেঘেদের মধ্যেও আজ তুমুল সংঘাত।
কচুরিপানা লজ্জায় আর গর্ভবতী হয় না।
বাতাসও আর পাল ছুঁয়ে বলে না, চল দূরে কোথায়...
এবারে পৃথিবীটার মৃত্যু দরকার,
নতুন প্রানী রাজ করুক এথায়।।
অনুজীবের দখলে চলে যাক পুরো পৃথিবীটা।
সবার অশ্রু মেকি আজ, সবার তলপেট প্রাসাদ চায়।
আমরা ঈশ্বরকে খুশি করি নকুল দানায়।।
ছিঁড়ে ফেলি এর ওর পতাকা।
মন্ডপ, চার দেওয়াল।
রক্ত গুলোয় গিজগিজ ভরে যাক অনুজীবের দখলদার।
এ পৃথিবী আর শান্ত হবে না।
শিরায় বমিতে এত ঘৃণা, এত বিচার...
চলুন মৃত্যুর আগে একবার আ আ করে গেয়ে উঠি রাগ।
সা... আ....রে..... গা... মা..... পা....
 
 
★ লেখা : প্রগলভতা
★ কলমে : বিষফল ( 18.10.21), 12.13 P.M

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

কাপালিক বাস



 

মিতা,
চারিদিক ভীষণ অন্ধকার লাগছে আমার ।
ঝুপ করে...
এগিয়ে আসছে পোড়া কাঠকয়লার সার,
চতুর্দিক কি অন্ধকার,
চিতা নেভান।
ওরা আমার দিকে এগিয়ে আসছে ক্রমশ,
ঝটপট করে উঠছে কাক বাদুড় গুলো।
ওদেরকে থামাও,
তুমি চিৎকার করো.....
সরিয়ে নাও সাদা কাফন গুলো।
চোখের সামনে থেকে.....
ছুটে যাচ্ছে ঘোড়ায় বাঁধা গাড়িগুলো।
তুমি থামাও......
তুমি সহিসকে ভৎসনা করে ওঠো আজ,
আমার রথের চাকা বিসর্জনে ককিয়ে উঠছে ব্যথায়।
প্রসব হবে, নিয়ন জ্বালো....
ময়দান হুইসিল দাও।
মিতা,
চারিদিক ভীষণ অন্ধকার লাগছে আমার।
থরথর করে কেঁপে উঠছে গাছের পাতা,বৃষ্টির ফোটা।
আমার বুকের থেকে হৃদপিণ্ডটা বের করে পেসমেকার লাগাও।
ময়দানে ঘিরে দাঁড়াক দূর্গের সেনা,
কবির সিনা চাক হবে আজ।
গান স্যালুট, ফায়ার....
ঘোঁড়ার গাড়িতে করে আসছে সিঁদুর,
তুমি পরে নাও।
কেঁপে কেঁপে ক্লান্ত ওরা আজ, খুলে দাও জোয়াল।
আমার রক্ত বমিতে সূর্যাস্ত এঁকো সারারাত...
ফাইন আর্টস, বসে যাও.....
গঙ্গার জলে আমার বির্য মুত্র সব,
তুমি ধারণ করো যোনিময়।
ঘোর প্রলয়.....
আমার খড়গের নিচে তুমি মাথা দাও,
মিতা, তুমি শুনতে পাও?
হে পৃথিবী, তুমি আমায় কাপালিক করে জন্ম দাও....
তুলসি তলায় খড় বিছাও
সারারাত কুয়াশায় নগ্ন হয়ে....
জন্ম দিই কবিতা।
মিতা,
চারিদিক ভীষণ অন্ধকার লাগছে আমার।
তোমার দু হাতের তালুতে নেমে আসে আজ...
যোনির শিৎকার।
দুঠোঁট কামড়ে উঠে আসবে আজ প্রকান্ড ঈশ্বর।
তোমার দুচোখের পাতাতে , বাঁকানো গলাতে জর্জরিত ঘাম।
সিলিংয়ে বনবন ঘুরছে বৈদ্যুতিক ফ্যান।
পোষাকহীন...
আমি পথ হাঁটতে থাকলাম,
হাতে গন্ডুল একটা।
 
 
★ লেখা : কাপালিক বাস
★ কলমে : বিষফল (16.10.21), 01.27 A.M.

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

আচ্ছন্ন


 


 

 নির্জন শ্মশান...
বুকের কলসিটা আছাড় মেরে ভেঙে ফেলি যেনো আজ ।।

বুকের মধ্যে দাউদাউ নেভাই ক্রমশ কাঠকয়লায়।
রেললাইনে বসে গুনি সার সার সহস্র বুকের দির্ঘ শ্বাস...
ট্রেনগুলো শহর ছুঁয়ে ফিরলে আলাদা একটা সুবাস নিয়ে ফেরে বোধহয় !
পেয়েছেন কখনও তা?
সন্ধায়? কিম্বা রাত? বারোটা একটা?
একবার শহর ফেরা ট্রেনের ঘ্রাণ নিন বুকটায়।

একবার প্রেম গুলোকে ঝাঁকান বুকটায়....
রেলের ওপর বসে নিজেকে ঈশ্বর ঠাওরান।
হাত, পা, হৃদয় ছুঁড়তে থাকুন নক্ষত্র মালায়।

তখন আপনি অমৃতের স্বাদের থেকে; আর বঞ্চিত থাকবেন না !

শবপোড়া ভুক পিঁপড়েদের স্বেচ্ছায় কামড় খেয়েছেন ?
অথচ পাকস্থলীময় অ্যালকোহল
কিম্বা দু আঙুলে শক্তকরে ধরা কারো জ্বলন্ত চোখ....

বুকের কলসিটা আছাড় মেরে,
পোড়া কাঠগুলোর পাসে শুইয়ে রেখে আসি রোজ।


★ লেখা : আচ্ছন্ন
★ কলমে : বিষফল ( 13.10.21), 10.15 A.M.


 

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

প্রাজ্ঞ



 

 
 
 
ঠোঁট ফেটে যাচ্ছে চুমুর স্বাদে,
নোনতা জল ঠোঁটে ঠ্যাকালে।

এত দুঃখ কোথা পাও হে নদী জানাবে?

চিকেন পকোড়া বিষ্ঠা লাগে,
লাল সবুজ সসে।

বলতে পারো চাউমিনের ডিমে কত শুক্র গোঁজা থাকে?

শশা কুচি ঠোঁটে দিলে,
আজন্মের খিদে উগরে আসে।

নদীর চরে এত বালি কোথা হোতে আসে?

উকুনের পেটের রক্তে...
বহুকাল উষাকাল লেখা হয়নি যে।

চিত হয়ে তুমি এখনও ব্লাকহোল গুনবে?

প্রহরগুলো শেষ হচ্ছে মেরু বরফ গলে,
ইগলু আমার নিঝুম আবাস, চুপ চুপ করে?


 
★ লেখা : প্রাজ্ঞ
★ কলমে : বিষফল (28.09.21), 10.47 P.M.

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

অপরাধ


 


 

 প্রকাশ্যে হত্যা আমরা আর উপহার দেবো না,
ত্রিশূল নামান.....

হিংস্র পশু লেলিয়ে কলোসিয়াম আর নয়,
মশাই আপনার চক্র নামান।।

লেচি ভ্যাঁটা নিন, ঘোরান....
ওভাবেই কি পৃথিবী ঘোরে বনবন?

বেআইনি অস্ত্র রাখার, হত্যার পারমিট পেলেন কোথায়?
কি বললেন? তালিবান?
ফাটকমে ঘুসাদো হারামজাদোকো....

জয় মা...
পাস দিয়ে বের হয়ে গেলো একটা সাঁইসাঁই রামদা,
নমস্তে ঈশ্বর।
এই নিন চাঁদটা গুঁজেনিন আপনার খোঁপায়।

আহ কি ধুনো গন্ধ চতুর্ময়
নিন রক্ত ঝরান....
আমার গায়ের রং,
মনের রং,
টুকটুকে কালো সব...
বিকট ৷।


আপনার প্রকাশ্যে হত্যা করা বাহুটা ধরে শহিদ হবো আজ....
সামনে সারসার আমার সন্তান।
ওদের প্রত্যেকের হাতে বেলুন এক একটা৷

কি ভীষণ নির্লজ্জ আর বেমানান এসময়,
ত্রিশূল, বন্দুকের নল নামান।

পড়ে আছে গোটা জান্নাত জাহান্নাম..
আপনি বিচারক?

আজান দাও, শাঁখ বাজাও....
প্রকাশ্যে নরহত্যা হবে আরেকটা ।।

কাফের কিম্বা রাক্ষস গুটিকয়।।
আহ, কি সুবাস কলোসিয়াম ময়।
বেলুন ওড়ান, বেলুন ফাটান,
এই নিন বন্দুকের নল...



★ লেখা : অপরাধ
★ কলমে : বিষফল (11.10.21), 07.47 P.M


 

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

কাম


 

 



তোমার মনের ত্বকে স্পর্শ করলাম.....
তুমি শিহরণে ছটফট।।

তোমার বন্ধ চোখের বাকল খুললাম....
হৃদয়টা কি ভীষণ নগ্ন জোছনায়।।

কালরাত থেকে নাকে আসছে প্রনয়সুবাস।

কলকল করে পাথরে নামছে জল....
ভেসে চলে প্রবাহে একান্ন খন্ড সতীর শব।।

আমার ফুসফুসে জমাট বাঁধে কালবৈশাখী ঘ্রাণ,
কাঁকর বালিই আমি থপ করে বসে পড়লাম।


কাঁকরোল গাছের ডালে সন্তানকামী চুড়ুইয়ের কি তীব্র চিৎকার


তোমার মনের ত্বকে স্পর্শ করলাম....

আঁৎকে উঠলাম,
চুল্লীর জঠরে এত কাম?

মেঘগুলো নেমে আসে পালের চোখটায়....
তরতর করে মন বেয়ে চলে যায়।

আমি আমার শরীরটা একান্ন খন্ড করে ফেললাম।।



★ লেখা : কাম
★ কলমে : বিষফল ( 09.10.21), 03.27 P.M.

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

ছিপ কড় বড়শি


 


 

 ★★★ ছিপ কড় বড়শি ★★★



ছিপে মাছ ধরে সে মাছ খাওয়াটার স্বাদকে বোধহয় অমৃত বলে। নয়তো অমৃতের স্বাদ মিথ্যা। যদি সেটা নিছক সোমরস জাতীয় কিছু হয়।
সবার শৈশবে কম বেশি মাছ ধরার চিরকুট অভিজ্ঞতা থাকবে না, তা হয় না।
ছিপ কঞ্চি হোক বা বেত। কেঁচো, ছোট ব্যাঙের বাচ্চা কিম্বা ঝিঁঝি পোকা গেঁথে মাছ তোলার তৃপ্তি সত্যি আলাদা। নিদেনপক্ষে রুটি করা আটা গুলে বড়শিতে লাগিয়ে পুকুরে বাদাতে ফেলেছি ঢেড়। শৈশবটা মাঠের সাথে সখ্যতায় গড়ে উঠেছে। কই শোল ল্যাটা জাপানি পুঁটি রুই মৃগেল কাতলা কখনও সখনো শিং মাগুর ফলি প্রভৃতি সব।
এখনতো মনপিয়া বেশি ওঠে। শৈশবে মনপিয়া রুপচাঁদ পুকুরে চাষই হতো না, নতুনই মাছ এসব। পুকুর ডুবে মাছগুলো সারা বাদায় ছড়িয়ে যায়। খালে মাছ ধরার অভিজ্ঞতা আমার কোনকালে ছিলো না। একটা সময় খালের পরিষ্কার জলে প্রচুর বোগো মাছ চরতে দেখতাম, খেতেও আমার দারুন লাগতো মাছটা। প্রত্যেকটা মাছের আলাদা একটা গন্ধ থাকতো।সেটা না এলে আহ... খেয়ে মজা হতো না। বাবা হাট থেকে নিয়ে আসতো তা। আগে গ্রামের হাটটায় কত রকম মাছ আসতো সব। তখন সেসময় কত মাছের পসরা। কত লোক হতো হাটটায়। সপ্তাহের দুটো দিন বিকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত যেনো মেলা বসতো। কত লোক কত আনন্দ। কত রকমের খাবার দাবারও আসতো। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম। বাবা বাইরের খাবার খেতে দিত না। যারা কিনে খেতো সেসব, মনে হতো কত সুখি তারা। বাবা নিয়ম করে ওই হাটে আসা নাপিতদের কাছে পাতা ইটটায় বসিয়ে দিয়ে বলতো কদমছাঁট করে দেবে, যেনো মুঠো মেরেও ধরা যায় না। আমার খুব খারাপ লাগতো সে সময়। যারা একটু বড় বড় চুল রাখতো, আমার খুব ভালো লাগতো তাদের চুলগুলো। হাটের এক ধারে উঁচু মতো পুকুরের পাড়ে তিন চারজন বুড়ো বুড়ো নাপিত বসতো হাটবার গুলোতে। আজ আর সে সব বসে না। চটকদার সব সেলুনে ছেয়ে গেছে। কত বড়বড় আয়না, কত দামি দামি চেয়ারে বসিয়ে আজ চুল কাটে সব। কোথাও
একটা স্বাদ মিস করি সেসব আজ না থাকায়। হয়তো সেদিন গুলোতে প্রাচুর্য ছিলো না,বড় করে চুল রাখার পারমিশন থাকতো না। তবুও সপ্তাহের দুটো দিন আমার কাছে মেলাই মনে হোত। চুলকাটা হয়ে গেলে ঘাড়ে পাউডার ঠুকে বলতো হয়েগেছে উঠে পড়ো খোকা। উঠে পড়তাম। আবার মুখ লুকোবার জন্য তৈরি হতাম। বাবার হাত ধরে বাড়ি ফিরতাম।


মাঠের মাঝখানে আমাদের একটা ঘর ছিলো সেসময় । চারিদিকে জলমগ্ন থাকতো প্রায় । আর ধান কাটা হয়ে গেলে মনে হতো চারদিকের পুরো বাদাটা আমার। নয়তো একা একা কাটতো সময়গুলো সব। ধান কাটার পর মাঠ শুকাতো, গ্রাম থেকে ছেলেরা আসতো পিচ করতো কেউ বা ফুটবল। বাবাও আমায় একটা ফুটবল কিনে দিয়েছিলো। ব্যাটবল খেলতে দিতো না। তখন সেজন্যও রাগ হতো খুব আমার। ওরা অতজন খেলে ওদের লাগবে না বল সাঁইসাঁই? আমায় নিয়ে ওরা বড্ড বেশি চিন্তায় থাকতো। বুঝতাম। তবুও রাগ হতো আমার। চুপচাপ কাটতো একা একা বসে জলের দিকে তাকিয়ে কেবল। লতাপাতা, গাছ, ধানের গাছ এসবই আমার একান্ত ঘোর শৈশব। আমগাছে তেঁতুল গাছে কত না পাখির বাসা হতো। উঠে ডিম চেক করতাম। বাচ্চা গুলোকে পেড়ে আনতাম। বাবা বকতো। মা ও। মন খারাপ হতো। আবারও গিয়ে রেখে আসতাম।


গ্রামের কত ছেলে ময়না পাখি বাঁসা থেকে পেড়ে নিয়ে কি সুন্দর পুষতো সব। আমার সে সুযোগও কেউ দিত না।

এখন যা ইচ্ছে হয় তাই করি, কারো বাধা শুনিনা। তবে পারিনা এখন সেই ঘুঁড়ি ওড়াতে, পাখির বাচ্চা পুষতে। এসময়ে হয় না কেনো এমন সব সখ?

এখন মনে মনে ওড়াই কত রঙিন কতরকম ঘুড়ি সব। ঘুমের মধ্যে লাটাই সুতো নিয়ে খেলি, কেউ কিচ্ছু বলে না।
শিশুদের শৈশব চুরির একটা মামলা করবো সময়ই হলো না তার।


গত রবিবার ডাক এলো, এটা আর স্বপ্নে নয়।
খালে মাছ ধরতে যাবি? কত রকম বড় বড় মাছ উঠছে সব।
বললাম চল।
দুজনে গেলাম স্টেশন থেকে চার বড়শি চোঁয়া পিঁপড়ের টিপ কিনলো রজত।

রজত। ও ব্যাটার আদ্যিকালের সখ।
কোথায় যাবি আজ?
খালে ছিপ ফেলতে যাবো আজ।
সবাই কত বড় বড় মাছ ধরে নিয়ে আসছে জানিস।
ও সবার মুখে শুনে স্থির থাকতে না পেরে বললো চল।


ওর বাড়িতে খেয়ে, দুটো ছিপ নিয়ে স্কুটিতে চেপে বসলাম।

জিজ্ঞেস করে করে দূরের একটা খালের কাছে ব্রিজের পাসে গাড়ি থামালো ও একটা সময়। গ্রাম ছেড়ে অনেকটা দূর। কি ঘন নির্জনতা সেথায়। জলের কাছে পৌছালে বুকের মধ্যে তোলপাড় করে মাছের সব ঘ্রান।
আহ জোর বাতাস নিলাম বুকটায়।

খালের পাসদিয়ে রাস্তা। জলে ডুবে হাঁটুজল।
বললো প্যান্ট গুটা, ও ও গুটালো হাঁটু অব্দি। জুতো খুলে হাতে সবার। আর এক হাতে কাঁধে ফেলা ছিপটা। আর একহাতে ব্যাগে চার মাছের খাবার।


টোপটা বানানোটা কম ঝক্কির নয় দেখলাম মনদিয়ে সব।
মিষ্টি দোকান থেকে কেনা স্লাইস রুটিটা একটা মগে কুচিকুচি করতে বললো ও। দুজনে করলাম। যেমন দেখালো করলাম। তারপর ও ঢেলে দিলো পিঁপড়ের টিপ। মাখালো। শোঁকালো কি দারুন একটা সুবাস। তারপর একটু চার দিলো মিক্সিং প্যাক দোকান থেকে কেনা। তারপর তাতে ঘি দিয়ে চটকে চটকে আহা কি খাসা মাছের টোপ এবার ।
ও বললো বহুজন খালে মাছ ধরতে আসবে, যার টোপটা তাদের পছন্দ হবে তার ছিপে উঠবে মাছ। মাছ ধরা অতো সহজ হয়।

মাছ আর বিলাসীনি নারী ভীষণ এক?


হাঁটুজল টপকে ডাঁঙায় উঠলাম। সোজা খালপাড়। বহুদিন পর এত গাড় নির্জনতায়। চারদিকে শুনশান। মাঠ আর মাঠ। ঘর বাড়ি ছাড়িয়ে শূন্যতায়। জলের ঢেউ ছুঁয়ে আসা বাতাস আপনারা নিয়েছেন কখনও ফুসফুসটায়? তাহলে বুঝবেন না কি ঘ্রাণ সে বাতাসটায়, কি স্বাদ।

হেঁটে চললাম। হেঁটে চললাম আরো নির্জনতায়।

এভাবে কখনও ছিপ বয়েছেন মশাই?

জলের স্রোত বড্ড সবজায়গায়। একটা গুঁড়ির কাছে এসে বসলাম। ছড়ালো ও চার।

মহাকাশ নিরবতায় দুজনে আমরা। ফিসফিস করে কথা বলবি ওর নির্দেশ ওটা।


ফাতনা নড়ে উঠলো আমার। জলের টান স্হির রাখা কি কঠিন যে হাড়ে হাড়ে টের পেলাম।
মিস করলাম। একটা বড়ো মাছ টোপ ধরে চুপচাপ ছিলো। এমনি তুলতে গিয়ে টের পেলাম বড় একটা মাছ খসে গেলো। আহ আফসোস। কাঁচা হাত কিনা। রজত তো পাকা শিকারী, ওর হাতে হলে তুলে ফেলতো । প্রকান্ড।

আবার দিলাম একটা হ্যাঁচকা টান। শালা কইমাছ। প্রথম বউনিটা আমি করলাম। ওর চোঁয়া আশাজনক নয়। শক্ত কমরেডের মতো বার্তা, কখন মাছ লাগবে বলা যায় না। দেকি একটা বিড়ি জ্বাল।

নাহ অনেকক্ষণ কোন বড় মাছের লক্ষ্মণ আমি ধরতে পারলাম না।
ধুর, ভাল্লাগে না। একটা কই আর এক রত্তি একটা পুটি মাছ।
ওর ছিপ তখনও উপোস।
অনেকক্ষণ পর বললো চল উঠি, এখানে আজ আর মাছ লাগার সম্ভাবনা দেখছি না। আরো ভিতরের দিকটায় চল। উঠলাম।

দু পাসে আগাছায় ঘন জঙ্গল। তার মাঝখান দিয়ে মাটির রাস্তা। মাঝেমধ্যে ইটের নজর পড়ছে। বহুকাল আগে রাস্তা ছিলো বোধহয়। এখন নিশ্চিহ্ন সব। হাঁটতে হাঁটতে একটা লোহার বাঁধ এর কাছে পৌছলাম। আমাদের মতো অনেকেই বসে জলের দিকে তাকিয়ে ঠায় নিরব।

কেউ চোখে জল এনে নদী বানায়, কেউ চোখটা জলে ডুবিয়ে রাখে সারাবেলা।
ও বললো ওরা সব বড়ো বড়ো মৎস শিকারী এক একটা। বিভিন্ন কায়দায় মাছ ধরতে ওস্তাদ।

ওখানে একা একটা বোগো মাছকে ঘোরাঘুরি করতে কতদিন পর দেখলাম। আহ কলজেটা এখানেও জুড়ায়। ওরা নাকি ছিপে সহজে ওঠে না। কি জানি, অতসব জানা নেই আমার।

না ধরছে দেখে ছিপটা দিয়ে জোর মারলাম। ও আর উঠলোই না। মরে গেলো নাকি বেচারা?
কেঁচো তোলা হলো। পুঁটি মাছ টোপ খেয়ে পালাচ্ছে সব। এটাই শেষ অস্ত্র। নাহ বড়ো মাছের সন্ধান পেলাম না। আবার পুরানো জায়গায় এসে বসলাম। পাসের মাঠে পাতা জালে একটা গোসাপ ছটকাচ্ছে দেখলাম। বেচারা আটকা পড়ে মরণাপন্ন অবস্থা। এই গোসাপে আমার ভীষণ শিহরন জন্মায়। গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। এই একটা প্রানীকে আমি দেখতে পারি না। গা ছমছম করে দেখলে ওটা। ছেলেবেলায় প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় পিছনে স্কুলে গিজগিজ ভাসতে দেখতাম। সঙ্গও লেগে কামড়ে ভাসতো সব। গা রিরি করা তখন থেকে জন্মানো বোধহয়। আমার ভয় করতো।
ছোটবেলায় মা বলতো ও নাকি যাকে একবার কামড়ায় মেঘ না ডাকলে ছাড়ে না। কি জানি ভয় আরো হতো।

আজ আটকা পড়ে দেখে কেমন মায়া জন্মায়। কতগুলো ছেলে এসে জোটে বাড়ি দিয়ে আঘাত করতে থাকে, গোসাপটা ছটকায় জালে জড়িয়ে বেচারা। পরিনতি মৃত্যু বুঝলাম। সে মন হোক বা জাল। নাহ আমরা আর বেশিক্ষন বসলাম না। মন ভার। উঠে হাঁটা শুরু করলাম। দূরে একটা ডিঙি দেখতে পেলাম। মাছ ধরছে পাতা জাল ঝেড়ে। তার কাছাকাছি তিনজন জাল ফেলতে ব্যস্ত সব। দাঁড়ালাম। মাছ ধরা দেখাও বড় তৃপ্তি কর। একজন তো একটা খলসে আর একটা মনপিয়া তুললো। ডিঙির লোকটা একটা পাওস মাছ। রোজ এভাবে এরা খোরাকি জোগাড় করে জানলাম।
কারো দুটো তিনতে হলে দিন চলে যায়। সে আশা নিয়ে আসে ওরা। ব্যস্ত পৃথিবীর সমস্ত জটাজাল ভুলে থাকলাম। ফোনটা বেজে ওঠার অপেক্ষায় ছিলাম। নাহ সারাদিন জগৎ বিচ্ছিন্ন ছিলাম।

ফেরার সময় আবাও পথ গুলিয়ে জিজ্ঞেস করে করে ফিরলাম।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মেডিটেশন মাছ ধরা। এ শিক্ষা টা বাড়ি নিয়ে আসলাম। ওদিন কপালে মাছ জুটলো না। আর বুক ভরা তৃপ্তিদায়ক মাছ না পাওয়ার আফশোস ও বোধহয়।


★ কলমে : বিষফল ( 04.10.21) 10.14 A.M.






 

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

 

   

 


 - গ্রন্থ মূল্যায়ন -


জীবন যন্ত্রণায় বিদ্ধ হলে কলমও যে কত তীব্র হাহাকারে ফেটে পড়ে তার উৎকৃষ্ট সনদ : কবি হুমায়ুন রসিদের কাব্য গ্রন্থ "অথবা মৃত্যুচুম্বন"।
এটি কোন নিছক বই নয়, একটা গোটা জীবনের নির্জাসিত যন্ত্রনা, প্রতিবাদ, স্পর্ধায় ঠাসা এক তাজা অমূল্য সমাহার ।
পাতা ওল্টালাম.... স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। সূচিপত্রের আগের পাতা খানি একরাশ কথা ঘোষনা দেয়: " যাঁরা আমায় অক্ষর চিনিয়েছেন - সাজিদুল হক ও আসমা বিবি "। সূচনা অনেক কিছু জানান দেয়।
কবিবর লকডাউনে যে আর্তনাদে ফেটে পড়েন - " রাষ্ট্রের যাঁতাকলে আমরা/ থেঁৎলে যাচ্ছি হঠাৎ-ই মৃত্যু ভালোবেসে মরে যাচ্ছি"।
পরক্ষণেই তর্জনি তুলে সূচিত করে- " একটি কালো সময়ের ভিতর/ গড়িয়ে যাচ্ছে সভ্যতার দিকভ্রান্ত চাকা"। কিম্বা " প্রতিটি ঘূর্ণন রেখে যাচ্ছে / নীল যন্ত্রণার ব্যর্থ পদচ্ছাপ"। আর " রাত্রির জঠরে ঘুমিয়ে আছে শতছিন্ন নদী"।
তারপরেও মাথা তুলে কম্পিত গলায়: " জিঘাংসার অগ্নিস্রোত চিরে চিরে/ আমরা একদিন নিয়ে আসতে পারবো/ রক্তিম নক্ষত্রের আলোর ছাঁট"?
ফেরার ডাকে কবি অবিচল : " কাকভেজা রাত পেঁচার মতো ফেরো/ এখন ফেরো যেকোন সময়/ গোপনে সংগোপনে অথবা প্রকাশ্যে / যেভাবে হোক ফেরো/ শুধু ফেরো শুধু ভালোবাসো একবার/ বন্ধহোক বুকের রক্তক্ষরণ "। তৃষিত হৃদয়ে বিশুদ্ধ ভালোবাসার বর্ষনই কাম্য। সে আহ্বানে নারী না প্রকৃতি কিম্বা ঝঞ্ঝাহীন বিশ্ব তা ছাপিয়ে যায়।
চোখ চলে যায় বাতানুকূল ঘরের বারান্দায়। উচ্চারিত হয়: "হিংস্র সারমেয় নির্মানে অক্ষম/বালি-সিমেন্টে মেশাতে পারে না রক্ত-ঘাম"। আর ওদিকে " সামান্য বৃষ্টিতে বারে বারে ভিজে যায় বাবুই-যের বাসা" । কিভাবে? তাও কবি ছবি দিলেন : " দগ্ধ জঠরের বিবর্ণ যন্ত্রণার দীর্ঘশ্বাসে"।
এ এক অন্য রকম বেঁচে থাকার ইতিবৃত্ত বটে। বলে ওঠেন : " স্বপ্নে চোখ মেলে দ্যাখো একবার/ বুকের জমিনে প্রস্ফুটিত স্বপ্ন"।
তাই তো তিনি বলতে পারেন একমাত্র, " হে প্রিয়তমা / বুকের রক্তপিয়ালি বয়ে যায় যাক/শুধু একবার স্বপ্নে দ্যাখো নিতান্ত ভুলবশত"। কিম্বা " শুধু একবার স্বপ্নে দ্যাখো নিতান্ত ভুলবশত / সিগারেটের ধোঁয়ায় বুকের পোড়া রক্ত"।
পরক্ষনে আর্তনাদ ছাপিয়ে ককিয়ে ওঠেন: " বাঁচতে চাও বাঁচো/ অথবা মৃত্যুচুম্বন/ লড়তে চাও লড়ো/ নতুবা দাসত্ব / আর কে না জানে দাসত্ব একটি মৃত্যুচুম্বন"। তিক্ষ্ণ চয়ন। কিম্বা " বাঁচতে চাও বাঁচো/বাঁচো বাঁচো এবং বেঁচে থাকো/ অথবা মৃত্যুচুম্বন"। সত্যি শিহরণময়। তীব্র যন্ত্রণা থেকে যে নিদারুণ চাওয়া উঠে আসে কলমে: "আমার কবরে থুতু ফেলো থুঃ থুঃ করে"। তবেই ঘটবে কবির শান্তিময় ঘুম নিরব। "এখন এইটুকুই তো চাওয়া" কবির কথায়।
কেননা ফ্যাসিবাদী চেয়ার দখলে : "বৃষ্টির গুঁড়োর মতো গুঁড়ো হচ্ছে জীবন/প্রতিরোধহীন পিঁপড়ের মতো/চুরচুর হয় স্বপ্ন/গুঁড়ো স্বপ্ন তরঙ্গের গর্ভে জন্ম হয় স্বপ্ন /এভাবেই এগিয়ে চলে জীবন"।
সেক্ষেত্রে জীবন : আলপথ থেকে আলপথ/ প্লাটফর্ম থেকে প্লাটফর্ম / যেভাবে ক্ষুধার্ত কুকুর/উঠোন থেকে উঠোন/ গ্রাম থেকে গ্রামান্তর / হন্যে হয়ে খোঁজে একমুঠো উচ্ছিষ্ট"।
সত্যিই জর্জরিত, নিশ্চিহ্ন হবে মানবতা ক্রমশ নয়তো।
কবি নিথর নিরালায় বসে ডাক দেন : "আমাকে যদি খোঁজ কোনদিন /মেঘেদের পাহাড়ে সন্ধ্যাতারার দিকে/পাবে না"। কিম্বা "আমাকে যদি খোঁজো কোনদিন / অববাহিকায় ঠিকরে পড়া অরণ্য চন্দ্রিকায়/সুবর্ণরেখা, মাতলার স্রোতে/পাবে না"। আর, " বসন্ত পলাশের নির্যাসে আকন্ঠ/আড় বাঁশি হাতে রকে বসা কিশোর দলে/ পাবে না"।
কারন, "কি করে পাবে বলো/আমি তো রাত্রির ধারলো কিনারায়"।
পরক্ষনে তীব্র রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে গর্জে উঠে সজাগ করেন : " যে কোন সময় লালনের মাটি দখল নেবে/হিংস্র হায়নার দল/তার লকলকে জিহ্বায় গেরুয়া গরল"।
আর সূচিত করেন বিপ্লবী জবাবে, "এ মাটিতে কবর খুঁড়বো হিংস্র হায়নার"। বলো রুখে দাঁড়াবার সত্যি সময় এলো।
" অবেলায় বুকে বুকে জাপ্টে থাকা পার্ক" কেও কড়কে জানান: " সব ফাঁস করে দেবো/আনমনে বসে থাকা ইস্টিশন/ব্যাগ ভর্তি না-দেওয়া চিঠি/বুক ভর্তি স্বপ্ন/গরম শ্বাস-প্রশ্বাস"।
অথচ যখন : "শ্রেনি বৈষম্য ছুঁয়ে ফেলে আকাশ", তখন " তুমি আমি বসে আছি বাল-গোধূলির পাড় ঘেঁসে/এমন সময় ভোজ্য তেলের দাম বাড়ে"। কি নিদারুণ শব্দাঙ্কন সব।
আর " ভোটে জিতে সে কী উল্লাস/ যেনো শুয়োরের গর্জন"।
হাহাকার যার গতিময়তা সে তো উচ্ছারনে জানান দেয়, " যে প্রেমে পুড়েছে হৃদয়/সে প্রেম কেনো আসে বার বার?/আমি তো চাইনি"। চরম বাস্তব সত্য বরাবর। প্রেম কষ্টের বাহন হয়েও অমৃতের দাবীদার।
তাই কবি বলে ওঠেন, " আরো একটি মৃত স্বপ্নের ভেতর/ স্বপ্ন-পোড়া আগুন ছুটে যায় প্রজন্মান্তর "। ঠিক এভাবেই ভাগচাষীর কান্না ব্যক্ত হয়।
প্রেয়সীর আত্মসমর্পণ এর ডাকে সূচিত হয়, " বলো সংসার-সংসার খেলায়/রক্তবমি উঠেছে তোমার গলা অবধি/ বলো ভুল খেলায় ছিন্নভিন্ন জীবন"।
চিরন্তন বন্দি প্রেমহীন সংসারের চিত্র এ এক ভীষণ ।
তাই কবি যেটা করেন, " সোনাগাছির গলি পথে হাঁটি/ একা একা হেঁটে যাচ্ছি কবরবাড়ি"। কিম্বা, " আমার পথের চৌদিকে ফুটে উঠছে প্রাক্তন ছায়া/বুকের ভেতর আছাড় খাচ্ছে মায়া"। আর, " মাতাল ঝড়ের অন্তরীক্ষে হেঁটে যাচ্ছি /চোখের রক্তে নিচ্ছি ইস্পাত শপথ"।
আর একে একে চোখে পড়ে, "ধ্বসে পড়া বালুস্তুপের মতো/ ক্ষয়ে যাচ্ছে সভ্যতার পাঁজর/মানুষ আর মানুষের মাঝে দীর্ঘতর হচ্ছে প্রাচীর"। আর সেসময়, " কুড়ি টাকায় ভাড়া খাটে সুস্থ যোনি আর/রাষ্ট্র ঘোষণা দেয় গরুর মূল্য "। কিম্বা তখন, " ধর্ম গৃহের দেওয়ালে সাঁটা হয় মোজাইক পাথর"।
নিখুঁত চোখে এড়িয়ে যায় না একচুলও বাস্তব গোপন চিত্রও কোনো। স্যালুট তাই সময়োপযোগী কাব্যে বিশ্লেষণ "অথবা মৃত্যুচুম্বন"।
" হাঁটতে হাঁটতে সন্ধে নামে পাড়ায় পাড়ায়/ হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়ে / সংসার-সংসার খেলায়"। বছর দশেকের একটা পেপসিঅলা।
চরম বেদনায়, " ঘুম ভাঙা মধ্যরাতে/এখনো আঁকো নেমে আসা বিকেল?" কিম্বা " বিলাপে বিলাপে পার হয় বুঝি জন্ম-জন্মান্তর"।
দ্রোহের কলমে যখন শানিত হয়, " কোন আগুনে পোড়ে না/রফিক সালাম বরকত জব্বারের রক্তমাখা জামা/পৃথিবীর কোন পুঁজিপতি কোন বেনিয়ার ক্ষমতা নেই/ একটি রক্তমাখা জামা কিনবার"। আর, "মৃত সূর্যের ভিতরেও পত্ পত্ উড়বে/ অ-আ-ক-খ খচিত একটি রক্তমাখা জামা"।
সত্যি এ লাইন গুলো সময়ের কাছে অমরত্বের দাবিদার।
কিম্বা চরম হতাশায়, "ভালোবাসায় বাঁধবো কাকে?/কোন হাতে রাখবো হাত?/সবাই হাত ছেড়ে দিচ্ছে "।
তাই উচ্চারিত হয়, " আমার কবিতা শ্মশানের ছাই ভস্ম খায়/আমার কবিতা বিদ্রোহে ক্ষিপ্রতায়/ছুড়ে দেয় মুষ্টিবদ্ধ হাত"।
কিম্বা, "আমার কবিতা ডাহুকের সুরতিথি লিখে রাখে/ইতিহাসের পাতায় পাতায়"।
পুরো কাব্যজুড়ে পরতে পরতে অসামান্য শব্দের বিন্যাস, চিত্রকলা এক এক । সৃষ্টি আর সৃষ্টিতে সমৃদ্ধ হয়েছে।
জেলেজীবন এর চিত্রে, " সাপের ফণার মতো ঢেউ ভেঙে ভেঙে/খুঁটে আনে পেট-খোরাক"। কেমনা, " এখানে জীবন/ প্রজন্মান্তর জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায়"।
কবির ক্লান্ত শরীর যখন বিছানায়, " চোখে চোখ রাখলে/ কিঞ্চিত স্পর্শ দিলে/ মুহুর্তেই তোমার চোখ কোকনদ,অর্ধনিমীলিত "।
তাই কবি উচ্চারণ করে, " গ্যারান্টি দিতে পারি আমার ওষুধ সেবনে/নিশ্চিত রোধ হবে তোমার ভাঙন"।
স্রষ্টা তো এমনই হয়, " আমি পথিক অথচ/ আমার কোন পথ নেই"।
অথচ কেবল ভাতের জন্য, " যা ইচ্ছা তাই করতে পারি/সীমান্তে কাঁটা তারে লাগাতে পারি আগুন"। কিম্বা, " আমার পেটে ক্ষিদে থাকলে/খেয়ে ফেলতে পারি/মন্দির - মসজিদ-গীর্জার মোজাইক পাথর"। " স্রেফ একমুঠো নুন-ভাতের জন্য /করতে পারি বিশ্বব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ "।
কেননা, " ক্ষুধার্ত মানুষের কেউ নেই/তুমি নেই রাষ্ট্র নেই কেউ নেই"।
সেখান থেকে ডাক দেন, "তীব্র অভিমানে বসে আছো বিষন্ন রাত্রির মতো একা/অঝোরে বৃষ্টি দুচোখে তোমার/তবু তুমি ফিরে আসবে না?"
কিম্বা "সব পাখি জানে গাঢ় গোধূলি তলিয়ে যায়/অথৈ তমিস্রায়/তুমি জানো না?"
তাই, " গোলাপের নাভিতে রাখি ঠোঁট/সাধ মেটেনা তাও"। আর, "বুকের অন্তরীক্ষে আষ্টেপৃষ্টে জাপ্টে ধরি নগ্ন মূর্তি /স্তনবৃন্তে রাখি তৃষ্ণার্ত ঠোঁট/সাধ মেটেনা তাও"।
তাই, " নির্জন টিলার পরে বসে/নিজেরই ছায়াকে দিই পূজো"।
আর ঘোষণা দেন, " হে জীবন/নিয়মতান্ত্রিক শিকল খুলে দিলাম"। আর বসন্তের আবাহনে, " রোদ-পোড়া কৃষকের নোনতা ঘামের/দুঃখ নিতে দাও"।
তোমার স্তনবৃন্ত ও নাভীর গভীরে ওষ্ঠচ্ছাপ/অক্ষরে অক্ষরে কবিতায় এঁকে/ আমি নিঃস্ব ও নষ্ট হতে চাই"। কেননা, " আমি তো নষ্ট হতে চেয়েছি বার বার"।
বিষাদ যন্ত্রণা গাঁথার পরতে পরতে অসামান্য সৃষ্টির গাঁথুনি আমি তো দেখলাম। মুগ্ধ হলেম চরম এক স্রষ্টার লেখমালায়। সত্যি, সাহিত্যসৃষ্টি আর বন্দি থাকবে না এলিট মিডিয়া ভিত্তিক।
 
 

★ গ্রন্থ দৃষ্টি পাতে : বিষফল (13.09.21)

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

 

   

       - গ্রন্থ মূল্যায়ন -





পাতা উল্টিয়ে লাইন পড়ে পড়ে কবিতার বই কেনা আমার চিরাচরিত অভ্যাস । কলকাতা বইমেলা ২০০৮
। সেইরকম ভাবে কিনে ফেললাম “দ্রাঘিমা ও প্রত্নবালিকা” । “কৃপা বসু” কবির নাম । নবীনা কবিরা এত অগ্নিসম্ভবা আরেকবার আঁচ পেলাম । প্রগতিশীল সমাজ ব্রান্ডেড কর্মশালার গুঁটিকয় কবিতে সাহিত্যকে আবদ্ধ দেখে তৃপ্ত হয়। চিরাচরিত প্রথা ভাঁঙা আমার অভ্যাস । তৃপ্তি দিল আমায় । প্রশংসা করতেই হয় শব্দজাল - বিন্যাস ।


নবীনা চোখের দৃষ্টিতে যাদের দুঃক্ষ বেদনা কবির লেখায় ধরা দেয় যেভাবে, “চিঠির ঘর বুনতে বুনতে ডাকবাক্স দের চোখে ঢুকে গ্যাছে চোরাবালি । / বহুকাল হল তারা হাসতে ভুলেছে।”

আর সেই সঙ্গে কবি কৃপা বসু জানান দেয় দৃপ্ত ঘোষনায়, “আসলে আমাদের জীবনে একটা নিরামিষ আয়নার বড়ই দরকার” ।

শব্দ চয়ন করতে গিয়ে তিনি জানান দেন, “অফিসের টিফিন ব্রেকে প্রিয় কবিতার কাছে এসে বসি মিনিট দশেক মতো, / আখরভান্ড ভেঁঙে শব্দ্সাজাই”।

কখনও প্রচন্ড আহ্লাদে , “বাথটবের সাবানজলে যে প্রেমিক পুরুষ শুয়ে থাকে সরস দৃষ্টি নিয়ে, / ফেনায়িত আদর মাখি তার চুপচাপ” ।

আর কবির ভূল হলে যা করেন অকসাৎ, “অবাধ্য চুল ভেবে পুড়িয়ে ফেলি জানালার পর্দা । / বুকের খনিজে বাড়ে নুনের পরিমান” ।

পরকীয়ার ইসারায় কবি কন্ঠে উচ্চারিত হয়, “পালতোলা নৌকার মত / ফুলে ফেঁপে ওঠা প্রতিশ্রুতির বাকল ঝুপ ঝুপ ভাঙে ঘষা জানালার কাঁচে” । কিম্বা, “কাঁচের রেকাবিতে তুলে রাখা / ঝাঁঝালো প্রেম যাকে পরকীয়া বলো তুমি, / তার চিবুকে এঁকে দিই সস্তার চুম্বন” । অনুভূতির জোয়ারে কবি কন্ঠে ধ্বনিত হয়, “এঁটো হাতে চেপে ধরি বিবিক্ত ঠোঁট , ধারালো দাঁতে কেটে ফেলি চাঁদের / চিকন সুতো” ।

আর দু চোখে, “স্পষ্ট দেখি নকশাওয়ালা চাদরের ফাঁকে ওর নাভিমূল বেয়ে চুইয়ে পড়ে / কবিতার আখর” । কিম্বা , “আর আমি ঘ্রান নিই, মজে যাই ছিঁড়ে যাওয়া / ঘুঙুরের শোকে” ।

অমর রহে কবির “শিমুলবালা” ধরায় । সত্যি এ এক রহস্যময়ী নারী, উচ্চারিত হয় , “সস্তা জামার বোতামে দুখিযালি নদী বেঁধে রাখি । সম্পর্কের কাঁটাতার / পেরিয়ে বটের পাতায় বৃষ্টি ধরে রাখাই আমার স্বভাব” । / ছুঁতে যাই ছুঁতে যাই কুসুমিত পড়সিবাগান । / ভয় নেই ভয় নেই ক্যাকটাসও মাটির সন্তান” ।

কবির চোখে সঙ্গম যে ভাবে ফুটে ওঠে, “গোটা শরীর জুড়ে / মীনকুমারীর কদম ফোটে, নিঃশ্বাস ভারি হয় বাতাসে বাতাসে”। কিম্বা, “সংসার ও শ্মশানের মাঝে এক ক্লোরোফিল দূরত্ব, ফুঁ দিয়ে তারা সাঁকো / তৈরি করে” ।

এক অন্য পূজোর বর্ননায় কবি কন্ঠে ধ্বনিত হয়, “মুঠো মুঠো ফুল ছুঁড়ে দিচ্ছে ঈশ্বরীর মুখ লক্ষ্য করে । পুষ্ট / টইটুম্বুর স্তন বেয়ে ঝরে পড়ছে ফুল , শুয়ে থাকা বলিষ্ট অসুরের গায়ে” ।

ভীত হন না কোন সত্য দৃশ্য চয়নে , তাই তার চোখে এটাও ধরা দেয়, “অনেকখানি নিঃসব হলে কবিতারা / চুঁইয়ে পড়ে ব্রহ্মহস্ত থেকে ধুলোর কাগজে,” ।

এছাড়া স্ফুলিঙ্গ থেকে পাওয়া যায়, “চোখের অতলান্ত গভীরে বাদাম রঙের সুবিশাল দেওয়াল, টাঙানো তাতে / অজস্র মিউরাল, রাজনৈতিক স্লোগান” । আর , “নুনের বাটি থেকে ছেঁকে তুলি স্নেহরঙের জল । / অসুস্হ কুকুরের মতো ধুঁকতে থাকা শহরের পোস্টমর্টেম করে পুরুষ্ট ঈশ্বর” । কিম্বা, “বিধর্মী রক্তের নোনা স্রোতে ভেসে যায় আব্রুহীন দুপুর –বারান্দা “ ।
পিতৃত্বের সংজ্ঞায় জানান দেয় , জন্মাবধি দেখা প্রথম শিল্পী বা অহংকারী ঈশ্বরও বলা যায়” ।
আর যেটা বিশ্বাদের, “গতরাতে ভূগোলের মাস্টার / তার ঠোঁট চটে খেয়েছিল । / আমার একটি মেয়ে ছিল “আলো” / এখন নেই” ।

শীত এলে কবির তুলি আঁচড় দেয়, “টুটাফুটা শীতের একটা পুরুষালি রূপ আছে, ঠিক যেমন ভাব ও / আখরের বানিজ্য করে ফেরা ইনসিকিওরড সওদাগর” ।
কবির প্রত্নবালিকা যেভাবে সংসারে আবদ্ধ হয়, “একদিন মেয়েটি সংসার মেখেছিল গোটা গায়ে, স্নেহের সাবান ঘষে ঘষে” । কিম্বা, “প্লেকট্রাম হারিয়ে ফেলা প্রতিটা বসন্তই আসলে, / পাখি হয়ে উড়ে যায় অন্য আকাশের ছাদে” ।

কবির চোখে অনুভূতির আরেক ছোঁয়া, “আমিষ কলবরের প্রিয় বুকপকেটে রাখা গুপ্ত কথাদের শুকনো খোলস / ছাড়ালে, ভেতরে যে তুলতুলে অংশটা / তাকে অনুভূতি বলে, ধিকিধিকি পুড়তে থাকে । বোকারা তাকে দুই / ঠোঁটের মধ্যবর্তী স্থানে শোয়া নিছক শব্দ মনে করে” । কিম্বা , ভাঙা পুতুলের মতো আমরা যেমন আদুরে তেমনই ইনসিকিওরড । / দস্তানার ভিতর বন্দুক নয় আঙুলে পেঁচানো বেলফুলের মালা, জুতোর / মধ্যে বিস্ফোরক নেই, শুকনো গোলাপ আছে রাখা, পাউরুটির পেটে / বারুদ নয় আলুর ঝাঁঝালো মশলা ভরা” ।

কবি নগ্ন খিদেকে যে ভাবে তুলে ধরে, “আব্রুহীন কাঠের গায়ে বাজে কুঠারের নূপুর । / শানিয়ে নেওয়া ঈশ্বরের জিভে জেগে ওঠে প্রিয় হরিণীর স্বাদ” ।

আর সন্ধানি কবি দু চোখে দেখে কূল না পেলে উচ্চারন করে, “হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকের খোঁজে যেসব চিঠিরা চুল খুলে দেয় জানালার গ্রিলে, / তাদের নির্দিষ্ট কোনও ডাকবাক্স থাকে না” । আর পরিনতীতে, “যৌবন রঙ স্তনে মেখে কুসুমবালা চিলেকোঠার টব থেকে উঠে বাগানের / মাটিতে বসেছে দু হাত ছড়িয়ে” ।
আর নিরবে বিড়বিড় করে, “আমার শুধু ভেসে যাওয়াটুকু আছে, ফেরার ঠিকানা হারিয়েছি বহু আগে” । তবুও মায়া জন্মায়, প্রাক্তন প্রেমিকের তরে, “শিকারী আলোর হলদে জানালার নীচে এক কৃষ্ণকায় হৃষ্টপুষ্ট পুরুষ লাল / নীল সবুজ চুড়ি বিক্রি করে । তার ইস্পাত কঠিন বুক থেকে ছিটকে / আসে ছাতিম ফুলের নরম ঘ্রাণ । / ভীষন ইচ্ছে হয় কোনও এক গ্রীষ্মের দুপুরে, পিঁড়ি পেতে শাকান্ন রেঁধে / তাকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে” ।

অতীতটা বারবার হানা দেয়, “কথা ছিল পার্সিয়ান ব্ল্যু হয়ে একে অপরের দেওয়ালে লেপটে থাকার” ।

প্রতিটা প্রেম, প্রেমিক, প্রেমিকা যেমনটি হয়, “সে একাধারে আমার মেয়ে, স্ত্রী, মা, আমার প্রেমিকাও বটে, ও / আমার সরসীবালা । বল্কল ত্যাগ করে কিরাতের মতো ফিরে আসি ময়লা / কুঠিরে” । তাই, “এক একটা মুহূর্ত দীর্ঘ হয়ে আসে যেমন সন্তান প্রসবের আগের / রাত” । কিম্বা, “কফির টেবিলে আমরা সমুদ্র আঁকি, অথচ বহ্নিপাঁজরে যে / স্বচ্ছতোয়া নদী কলকল করে বয়ে যায় আব্রুহীন কাঁটাতার ছুঁয়ে, তার / খোঁজ কি কেউ রাখে ?”

বাজে অবক্ষয়ের বাজনা, “নিখোঁজ হওয়ার আগে প্রতিটা চিঠির ঠোঁট থেকে মুছে যায় / প্রেমিকের ঘ্রাণ । রোদ গিলে খাওয়া লেপের রোঁয়ায় জলের যে দাগ লেগে / থাকে তা আসলে একপ্রকার অবক্ষয়” ।
বাঁচার আহ্বান যেভাবে ধরা দেয়, “সোনালি ধানক্ষেতের পাশে শোয়া ছাইরঙা খাল, উপর দিয়ে বয়ে চলে / সন্ন্যাসী হাওয়া” । কিম্বা, “আসলে মা বুঝিয়ে দিয়েছে কেমন করে মানিয়ে নিতে হয়, আধসিদ্ধ / ডিমের নরম কুসুমের মতো” । তাই কবি যেভাবে ধরা দেয়, “ অনেকখানি ক্লান্ত হলে প্রিয় কবিতার কাছে নগ্ন হই” । আর আহ্বান করেন, “এসো আগুন এসো ছুঁইয়ে দাও তোমার প্রসাদী ফুল আমার কপালে” ।

ইন্দ্রিয়কে সজাগ করতে কবি লিখে ফেলেন, “ এই যে ব্লেডরঙের আকাশ প্রতিদিন একটা করে বিধবা চাঁদ চিরে ফেলে / কখনও তার নিরীহ শীৎকার শুনেছেন ? / পা বেয়ে চুঁইয়ে পড়ে রজঃস্রাবের লাল, অথচ গোটা শরীর মন জুড়ে / মেয়েটিকে বন্ধ্যা হতে দেখেছেন ?”

সম্পর্কে তিনি দেখেন, “ওর ভিজে সপসপে গা বেয়ে / গড়িয়ে পড়ে বীজভাঙা নোনা পানি । আমি মুখ ডুবিয়ে টাটকা মাছের গন্ধ / শুঁকি” । সঙ্গমি নারি কন্ঠে তুলে দেন যে বানী, “বৈধতার বল্কল খসিয়ে পারদের মতো ওঠানামা করি ওর জিভের / গভীরে” । কিম্বা, “নারীজন্মের সমস্ত গোপন কথার পান্ডুলিপি ফাঁস হয়ে / যাক ওর সম্মুখে । ঈশ্বরের বর্ম ভেদ করে প্রকৃত প্রেমিক হয়ে উঠুক” ।

এত সম্ভবনা কি হেলায় ফেলবার , হে নবীন কবিদল, পাঠক সমাজ ? কবি কৃপা বসুর “ দ্রাঘিমা ও প্রত্নবালিকা” ঠাঁই পাক সেইসব বোদ্ধা মননশীল কবি পাঠকের হাতের তালুমুদ্রায় । নিরীহ আমি তো দেখলাম, এবার আপনার পালা ।

 

 

* গ্রন্থ দৃষ্টিপাতে = বিষফল

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

 

                                                                    

 

                                                                         - গ্রন্থ মূল্যায়ন -


পড়ছিলাম এক "অনু উপন্যাস"। পরতে পরতে এত টান টান সৃষ্টি-কাজ, এক বিরল নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সাথে সাথে পড়ে শেষ করা যায়। হ্যাঁ, আমি পড়ছিলাম আস্তিকপুরের এক কবি, লেখক ও ছড়াকার 'মহম্মদুল হক' এর লেখা "মঙ্গলময়" নামক রহস্যময় এক অনু উপন্যাস।
নাম ও লেখক দিয়ে কিছু মনস্ক বরাবর লেখার ধাঁচ ও কল্পিত তির্যক ব্যঙ্গাত্মক প্লট খুঁজে সরিয়ে রাখে সে সব লেখা ও বইপত্র। এটা চরম হতাশার সাহিত্যের মুক্ত মঞ্চটায়।
নাহ, এমন কিছু হয়নি বলেই নিজেকে ঢুবিয়ে দিয়েছিলামঃ তাঁর লেখা মঙ্গল গ্রহকে নিয়ে এক সায়েন্স ফিকসান।
গল্পের নেতৃত্ব কলকাতার বিজ্ঞানি ধনচাঁদবাবু যেনো এক "ভেতো বাঙালি - অকর্মার ঢেঁকি" শব্দ গুলিকে নিমেশে ফুৎকার দিয়ে লালমাটি মঙ্গল গ্রহে তাঁর স্বপ্নের মহাকাশযান "জিনিয়া" নিক্ষিপনে অপেক্ষামান। বহুবিধ বাঁধা অন্তর্ঘাত অতিক্রম করার পর। একের পর এক
খুন, চক্রান্ত, প্রেম, বিহ্বল ও রহস্য জ্বলজ্বলে ছবিতে উজ্বল।
নিখুঁত দৃশ্যপট সব। ছায়াছবির মতো চোখের সামনে স্পষ্ট হবে চরিত্রগুলো পঠনকাল-সময়।
তাঁর অনু-উপন্যাসের চরিত্র গুলো হাতিবাগান, তোপসিয়া, পূর্ব বর্ধমানের আস্তিক পুর কিম্বা সোনাগাছির পল্লির ভীষণ নিজস্ব।
গল্পেঃ " ধনচাঁদবাবু জীবনে এই প্রথম আবেগমথিত কন্ঠে বললেন, লালগ্রহে কেউ কোনদিন যদি তোমার পদবী জানতে চায় তাহলে তুমি নিঃসংকোচে নামের শেষে আমার চাঁদটা যোগ করে বোলো!"
উক্তিটি ছিলো গল্পের বীর নায়িকা, সোনাগাছি পল্লি থেকে তুলে আনা' কঙ্কনা' (কণা) - র উদ্দেশ্যে।
লালমাটিতে পৌছবার পর একের পর এক রহস্য, কঙ্কাল-মৃত্যু, বিভীষিকা। আর মাঝখানে ফুটে ওঠা জীবন সংগ্রাম আর প্রেম সংসার নতুন মাত্রা এনে দেয়।
চরম শিহরণ বিদ্যমান, " কণাই এখন তো তার মস্ত বড় এক বই। ওকে পড়লেই এগ্রহে রচিত হবে মস্ত এক মহাকাব্য"।
কিম্বা, " কি সুন্দরীই না দেখাচ্ছে তাকে। চুলগুলো বেড়ে যুবতী বুকের উপর দিয়ে হাঁটু ছুঁই ছুঁই। ওগুলিই তার লজ্জা ঢাকার আবরণ"।
" কণা ওর দু'হাতের আঙুলের ফাঁকে আঙুল গলিয়ে চাপ দেয়। আদ ঠিক থাকতে পারে না এ স্পর্শের আবেদনে। এখন গাছের নীচে সে তার কামনার সঙ্গীনিকে নিয়ে সৃষ্টির উদ্দামতায় মগ্ন"।
আদমান ( আদ) গল্পের নায়ক।
বিশেষ উপলব্ধিতে,
" এখনো এগ্রহে আগুন জ্বালার ব্যবস্থা নেই। তাই লোভ ভোগের ধোঁয়াও নেই। জীবনে তাই ধোঁয়াশার মানসিকতাও নেই"।
" বাঁচার জন্যে সংগ্রাম আছে ঠিকই তবু একান্ত নিজস্ব এ জীবন ধ্বংসের জন্যে ভুলেও ভাবেনা। শুধু কাজ করে সৃষ্টির জন্যে"।
গল্পে, " গাছগুলো মানুষের যত্ন পেয়ে বাচ্ছা ছেলের মত দামাল হয়ে উঠেছে"।
আর কণা আর আদ, " পাসাপাশি বসে ওরা কত কথা- কত স্বপ্ন গড়ে চলে তার পর...... "।
মঙ্গলে জলকেলির পর, " কণাও আদের দিকে বিহ্বল ভাবে চেয়ে আছে। দেখার ভুল হয় নি তো তার? সে তো আদই ! কি অসম্ভব সৃষ্টি এক পুরুষ ! ওরা এভাবেই দাঁড়িয়েই থাকে । চুল থেকে জল চুঁইয়ে শুকিয়ে চুল রেশমের মত হয়ে গেছে তবু পরস্পরকে দেখা যেন শেষ হয় না। মুহুর্তে মুহুর্তে ওদের সৌন্দর্য্যতা যেনো বেড়ে যাচ্ছে। আদ কণার কাছাকাছি হয়। কণা মাটির দিকে দৃষ্টি নামায়"।
এখন নিখুঁত বর্ননা পুরোটাতে।
চোখ বন্ধ করে পাশাপাশি শুয়ে চিত হওয়া কণাকে, " আদ বলে, কত তারা ফুটেছে দেখো কণা !
ইস্! সত্যি তারা তো! কণা উঠে বসে "।
" চুপি চুপি কানে কানে বলেছিলো, তুমি কিন্তু চিরকাল আমার কাছে এই আদিম পুরুষটি হয়েই থেকো আদ" !
হলপ করে বলতে পারি সহজ সরল ভাবে আবেগময়তা পুরো অনু উপন্যাস টিতে আপনাকে কল্পনায় এক অন্য জগতে পৌছে দেবে।
 
 
★ গ্রন্থ দৃষ্টিপাতে : বিষফল ( 22.09.21), 04. 34 P.M.

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

কতক বসন্ত

 





"বিষফল" তখন সদ্য মাধ্যমিক পাস করে জয়নগর ইনস্টিটিউট এর বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। বরাবরই অধ্যায়ন নিয়ে একা একা মগ্ন থাকতো সে ভীষণ। শৈশব থেকে এ যাবৎ কড়া ঘেরা টোপে বইই ছিলো তার এক মাত্র দোসর। বাবাই এনে দিতো যত রাজ্যের বইপত্র। এহেনো জীবন যাপনে তার জীবনে আরেকজন স্থান করে নেয় চরম। নিরবতার অবসান হয় ক্রমশ। কাকতালীয় ভাবে কাকলি আর বিষফল একে অপরের প্রেম হয়ে ওঠে। দুজনের জন্ম ভিন্ন ধর্মীয় পরিবারে। ছেলেটি মুসলিম পরিবারে আর মেয়েটি হিন্দু পরিবারে জন্ম গ্রহন করে । বহু প্রতিকূলতা তাদের সামনে। ভিন্ন ধর্মে বিয়ে প্রথা, বিশেষ করে গ্রামে,তখন তিব্র হিংসাজনক ঘটনা একটা।
কাকলি পড়তো জয়নগর গার্লস স্কুলে, আর বিষফল বয়েজ স্কুলে। তাদের উভয়েরই বাড়ি একই গ্রামে। বড় গ্রামের এ প্রান্ত আর ও প্রান্তে বাড়ি উভয়ের । বাসে করে স্টেশন, তারপর ট্রেনে করে স্কুল যাওয়া। এমনটা ছিলো বর্তমান স্মৃতির পথমালা। নতুন স্কুল।মাত্র কটা দিন ক্লাস করে দিব্যি বাড়ি ফিরছিলো। তখনও বিষফল অপ্রেমিক একটা।
একদা কাকলি, বিষফল আর আরেকটা ওদের পাড়ার দিদি এক সাথে ট্রেনে ওঠে। সেদিন ট্রেন থেকে ওরা নামেনি, নেমেছিলো বিষফল কেবল। পরের দুদিন পর কাকলি আবার স্কুলে আসে। স্কুল শেষে, তাদের দেখা স্টেশনে হয়। বিকাল। একটা স্টেশন পরে মথুরাপুর স্টেশন। দুজনের গন্তব্য এক। তারপর বাসে করে আবার কখনও কখনও সাইকেলে করে বাড়ি ফেরা। ওদিন জয়নগর স্টেশনে বিষফল কাকলির থেকে জানতে চায়, গত সেদিন স্কুল ড্রেস পরে সে কোথায় যায়। কাকলি স্পষ্ট উত্তর দেয় সিনেমা দেখতে যায় । স্কুলে যাবার নাম করে সিনেমা দেখতে যাবার জন্য এমনি-ই কাকলিকে বকাবকি করে বিষফল। পড়াশোনায় অষ্টরম্ভা তার উপর স্কুল কামাই করে সিনেমা দেখতে যাওয়া। তখন আচমকা কাকলি বলে.... 'আর কোনদিন যাবো না', বলে মাথা নিচু করে নেয়। তারপর কিছুক্ষন চুপচাপ। হঠাৎ মাথা তুলে চোখের দিকে তাকিয়ে মুখ চেপে হেসে বলে... 'তুই বললে যাবো, তার আগে নয়'। আবার মাথাটা নামিয়ে নেয়। মুখ টিপে হাসতে থাকে, আমি চোখ সরিয়ে নিই ওর থেকে । জানিনা কি হয়েছিলো তখন, বোঝাতে পারবোনা। চুপচাপ এক জায়গা থেকে ট্রেনে উঠেছিলাম। সেদিন ও আর লেডিস কামরার দিকে পা বাড়ালো না।
তখনও বিষফল অপ্রেমিক একটা। রসকষহীন কাঠখোট্টা। সেদিনটা বাড়ি ফেরে এভাবে ওরা দুজন । এরপর রোজ ওর টিফিন বক্স হাতড়াতাম কেনো জানি না । ওর আগে ছুটি হলে স্টেশনে এসে বসে থাকতো চুপচাপ। স্টেশনে এসে স্কুল থেকে ফেরার পথে খেতাম প্রায় । ও খেতো না, তাই বিকাল পর্যন্ত থাকতো সবটা। রেখে দিতো আমার জন্য বুঝতাম । এলে হাতে ধরিয়ে দিতো গোল টিফিন বক্স আর জলের বোতলটা । তারপর প্রায়শই টিউবওয়েলের জলে মুখ ধুতাম। ও ওর শাড়ীর আঁচল এগিয়ে দিতো, মুখ মুছতো বিষফল।
এভাবে এক সাথে আসা যাওয়া, টিফিন খাওয়া, হাসি ঠাট্টা, কারন অকারনে ওর সাথে মারপিট চলছিলো সব । অপ্রেমিক বিষফল তখনও । একজন কখন যে কার প্রেমে পড়ে, সে ক্ষন নির্নয় করা বড়া কঠিন ও সমস্যার। এদেরও তাই হয়। বাড়ি ফিরে বিষফল ভাবতে থাকে...তুই বললে যাবো। মেয়েটা তবে কি তাকে ভালোবাসে নিশ্চয়? নয়তো এভাবে কেনো বললো? একবার পরীক্ষা নেবো তা। এমনটা বিষফল মনে মনে ঠিক করে নেয়। চলছে ক্রমশ একসাথে আসা যাওয়া। চোখের ভাষা পড়তে চাইতো বিষফল। কাকলির দিকে তাকিয়ে থাকতো তখন নিরব প্রায়শই । ওর হাসিতে গুলিয়ে যেতো সব।
একদিন পরীক্ষা করার জন্য কাকলিকে এক সাথে সিনেমা দেখতে যাবার কথা বললে ও রাজি হয়। স্কুল ব্রাঙ্ক করে সোজা বারুইপুর। দুঃসাহসিক সফর তখনকার সময়। কাকলি টিকিটের টাকা দেয়। "মিলন" সিনেমা হলের নাম। প্রথম সিনেমা দেখা প্রসেনজিৎ এর "অগ্নি পরীক্ষা "। সেই সঙ্গে বিষফল-কাকলির প্রেমের পরীক্ষা শুরু হয়।
নাহ তখনও কেউ কাউকে স্পর্শ করিনি। হাতও ধরতাম না। এতটাই নিরিহ ছিলাম। বাড়ি ফিরলাম। আবার কয়েক দিন পর স্কুল ছুটি করে ডায়মন্ড হারবার। "প্রাণের স্বামী" সিনেমা চলছিলো সেদিন। সে দিন আমরা একে অপরের স্পর্শে প্রেমিক ও অবিচ্ছেদ এর পথচলা শুরু করি। ওদিন অনেক কথা বলি। ওর হাতে হাত রাখি।
হ্যাঁ কাকলি আর বিষফল এভাবে একে অপরের কাছে আসে, পথ চলে দীর্ঘ দুবছর একসাথে ওরা । ধর্ম সেখানে প্রয়োজনে আসেনি একদিনের জন্যে। ভালোবাসতে ধর্ম লাগেনা, জেনেছিলাম সেদিন আরো বেশি করে । আজ সবকিছুর উর্ধ্বে বিষফল একজন নাস্তিক জীবনযাপন করে। তার জীবনের প্রথম প্রেম কাকলি চির মর্মে ।
ওর বাড়িতে মাঝে মাঝে ওকে ইংরেজি পড়াতে যেতাম। ক্লাসে বরাবর ইংলিশে ফাস্ট বয় ছিলাম। ও ইংলিশে কাঁচা। ও ইলেভেনে আর্টস। ইংলিস কম্পালসারি সবার। সন্ধায় ওর বাড়িতে যেতাম। ও ওর বাবার থেকে পারমিশন করে নিয়েছিলো কি করে জানি না, আমায় বলেছিলো মাঝে মাঝে যেতে সন্ধায়। পড়ানোটা মিট করার বাহানা মাত্র একটা। ইংরাজি গ্রামার গুলো বোঝাতাম, ও তাকিয়ে থাকতো হাঁ। অমনোযোগী ছাত্রী একটা, হয়তো আমি শিক্ষক ছিলাম তাই অমন।
ফেরার সময় এগিয়ে দিতে বাইরে বের হতো। দুই পাড়ার মাঝে একটা প্রকান্ড সবেদা গাছ, পাসদিয়ে সরু পায়ে হাঁটা রাস্তা । গাছটা থেকে ওর বাড়ি পনেরো কুড়ি পা, ওই পর্যন্ত ও আসতো। এ পারে মুসলমান পাড়া। আমার বাড়ি একেবারে গ্রামের শেষ সিমানায়।
অন্ধকারে ঝাঁকড়া বড়ো গাছটার নিচে আরো গাড় অন্ধকার ভর করতো। সেই তিব্র অন্ধকারে ওর চোখদুটো দেখতে পেতাম না। ঠিক তখন একে অপরের হাতদুটো শক্ত করে ধরতাম। তখনই বুঝতাম ওর চোখদুটো সেই অন্ধকারেও অনেক কিছু কথা বলতে চাইতো নিরব । আমরা দুজনে চকিতে একে অপরকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ফিরতাম সজাগ। যার আয়ুষ্কাল কয়েক সেকেন্ডের বেশি দীর্ঘায়িত হতো না, পাছে পৃথিবী টের পায় । ওর বাবা আমায় খুব স্নেহ করতো। গ্রামের প্রথম বিজ্ঞানের ছাত্র। কদর করতো, আসলে স্নেহ।
একদিন না কাছে এলে মরতাম। ও ও। আজ; ও স্মৃতি কেবল। কখনও ভাবতাম না, ও কোনদিন আমার জীবন থেকে চলে যাবে বা যেতে পারে কখনও। একদিন যদি না মিট করতাম, ও সোজা আমার বাড়িতে চলে আসতো। গ্রামের সবাই সন্দেহ করতো। একটা হিন্দুর মেয়ে কেনো বাড়ি বয়ে আসে, কি জন্য। গুঞ্জন ভাসতো।
ক্রমে পড়াশোনার চাপ, টিউশন সব জয়নগরে। গ্রামে সায়েন্স এর মাস্টার ছিলো না। আসা যাওয়ায় বহু সময় নষ্ট হচ্ছিলো আমার, শরীরও ক্লান্তিতে জেরবার হচ্ছিলো সেসময়। অগত্যা মেসবাড়ি। হালদার মেসে উঠলাম। আরো মিট ঘন ঘন হলো, অগাধ স্বাধীনতায়। সিনেমা হল, নদীর পাড়। হেঁটেই চলতো সময় পার। তখন ২০০৬ সাল। বৃষ্টি, রোদ, ঝড়, জল এক সাথে অনেক কাটলো এক এক।
বক খালি আজও স্মৃতিময়। সকালে যেতাম, বালিতে হেঁটে, ঝাউবন ঘুরে দেখে, জলে পা ভিজিয়ে ভিজিয়ে চলে ক্রমশ ক্লান্ত হলে বিকালে ফিরতাম। ওর চুলের ঘ্রাণে সর্বদা মোহিত থাকতাম। আজও চোখ বন্ধ করে বাতাসে শ্বাস নিয়ে বলে দিতে পারবো ওর উপস্থিতিটা। এভাবেই চলছিলো সব। আর অন্য দিকে রাতজেগে পড়া। জয়েন্ট এন্ট্রাস এর মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ার এর প্রস্তুতি নেওয়া শুরু হয়। ঘুমাতে যাবার আগে বইয়ের মধ্যে গুঁজে রাখা ওর ছবি দেখে তবেই ঘুমাতাম। এ খবরটা রাতারাতি মেসের সবার কানে এক এক করে পৌছে যায়।
বাবা মাঝে মধ্যে এসে দেখে যেতো আমায়, আমিও একরকম বাড়িতে যেতাম না বিশেষ কারন ছাড়া। আজও মনে পড়ে বাড়ি থেকে ফেরার সময় পিছন ফিরে তাকালে আমার মা, বোন, ছোট ভাই, বহুদিনের পরিচিত ভিটেমাটি, পুকুর, গাছপালা আমায় বোবা টানতো, ডাকতো ...... আমার চোখে জল আসতো। নিরবে চোখের জল মুছে আবার মেসে ফিরে আসতাম। জয়নগর বহুকাল আগে থেকে পৌরসভা, প্রসিদ্ধ ও কীর্তিময় একটা জায়গা।
হঠাৎ মেস বাড়ির এক দাদা আমার বাবার কাছে বইয়ে গোঁজা কাকলির ছবিটা তুলে দেয়। আমি তখন প্রেমের সাথে পথ হাঁটছিলাম। এসে শুনি সব। দু বাড়িতে জানাজানি হয়, বাবার রোষের কবলে পড়লাম । পরে শুনেছিলাম, সেদিন রাতে বাবা ওদের বাড়িতে চড়াও হয়। ফটোটা ওকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো ওটা কার? ও বলেছিলো "আমি না"। ওর বাবা ফটোটা হাতে নিয়ে মাথা নিচু করেছিলো। বাবা কড়া কড়া কথা শুনিয়ে বাড়ি ফিরেছিলো।
তারপরেও আমরা মিলতাম।
মেস জীবনের ইতি টানতে হলো সব জানা জানির পর। চলতে চলতে তখন প্রায় দু বছর।। প্রেম, নাস্তিকতার পাঠ, স্কুল লাইব্রেরির সমস্ত বই এক এক করে চষে ফেলা... দর্শন, বিজ্ঞান, সাহিত্য, ধর্মগ্রন্থ, ইতিহাস, ভূগোল প্রভৃতি সব।।
দূরত্ব তৈরি হল। দু বাড়িতে যাওয়া বন্ধ হলো।
পথে টিউশনে দেখা মিলত। বেশিক্ষণ কাটানো বাম ছিলো। বকখালি গেলাম একদিন দুজন। সেদিন বালিতে বসে, চারিদিকে ঝাউবন, খুব কাঁদলাম দুজন। পরস্পর কে আঁকড়ে তখন। সমুদ্র গর্জন, প্রচন্ড বাতাসের শব্দ মুহুর্তে দুজনের কানে পৌছয়নি আদৌ। ওর মাথাটা শক্ত করে বুকের মধ্যে নিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে ছিলাম।
এর কিছুদিন পর, কাকলি আরেকটা চরিত্রের সাথে সখ্যতা বানিয়ে ফেলে। বিষফলের পিসির জা এর মেয়ে। ফতেমা। সহপাঠী। টিউশন মেট।
একদিন ওরা দুজন মেয়ে বকখালি পৌছায়। সেদিনটা ওরা বকখালিতে থেকে যায়, রাত্রি কাটায় কোন একটা বাড়িতে স্বল্প টাকায়। বাস পায়নি ওদিন ওরা। কেনো সেদিন ওরা শেষ বাসটা ধরতে দেরি করেছিলো সে রহস্য আজও অজানা। জানা হয়নি কোন ভাবে কারো থেকে, নিরব ছিলো ও বিষয়ে ফতেমা, পরে দেখা হলে । কাকলি বাড়ি ফেরে পরের দিন সোজা, আর পিসির মেয়ে বাড়ি যায়নি বকখালি থেকে ফেরার পর। ফতেমা গিয়ে উঠেছিলো অন্য একটা আত্মীয়ের বাড়িতে। বাইরে রাত কাটানোর জন্যে বাড়ি থেকে ওর দাদাদের কাছে মার খাবার ভয়ে। পরে জানলাম এসব। পিসির জা এর বাড়ি থেকে খোঁজ খবর চললে, বিষফল পৌছে যায় কাকলির বাড়িতে। ওর বোন এসে জানায়.... দিদি তোমার সাথে আর দেখা করবে না।
কি এমন হয়েছে যে কাকলি আমার সামনে মুখ দেখাতে চায় না আর? এ প্রশ্নটা আজও বিঁধতে থাকে বিষফলের বুকটায়। সমস্ত টুরিস্ট স্পট গুলো সম্বন্ধে কম বেশি খারাপ ধারনা সবার থাকে, আঁৎকে উঠতাম। কি এমন হয়েছিলো সেদিনটায়?
জড় পদার্থ ও মানুষ হয়, সেদিন হয়েছিলাম।
নাহ তারপর আর কোনদিন কাকলি সামনে আসেনি আর। সামনে পরীক্ষা এইচ. এস। স্কুল টিউশন বন্ধ সে সময়।
তখনও কারো কাছে ফোন ছিলো না।
অনেকদিন পর ফতেমার সাথে দেখা হলে জানায় কাকলি ভালো মেয়ে নয়। তুই ওকে ভালোবাসিস?
বলে... তার রাত্রি বাসটা বাথরুমে হয় সারারাত । কাকলিরটা সে জানে না, কয়েকজন ছেলের সাথে কথা বলছিলো, হাসি ঠাট্টা করছিলো নাকি শুনেছিলো এইমাত্র । এর বেশি আর কিছু সে জানায়নি আর। ছেলেগুলো কারা কোথাকার? সে প্রশ্নের উত্তর ফতেমা দিতে পারেনি আমায়। এবিষয়টা নিয়ে কথা বলতে চাইছিলো না, দেখছিলাম তার চোখে মুখে অস্বস্তির ছাপ। থেমে ছিলাম। আজও অজানা সেসব।
সন্ন্যাসীর মতো উদভ্রান্ত জীবনে প্রবেশ করলাম। অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিলো সব। ওর দূরত্বটা, ওর যোগাযোগ হীনতা, রহস্যময়তা গুলো।
তখন কারো কাছে ফোন ছিলো না।
অনেকদিন পর, ওর পাড়ার সেই দিদির থেকে কাকলির নাম্বার নিই। আমার তখন প্রথম ফোন হয়। ও জানায়... আমি যদি ওর জীবনে আসি, ও সুইসাইড করবে। ওর জীবনে নতুন একজন এসেছে, সে ওর অনেক কাছাকাছি এসেছে । আর সম্ভব নয়।
আমি নিজে থেকে ফোনটা কেটে দিয়েছিলাম। ভালো থাকুক ও। মুক্তি দিলাম, ও মুক্তি চায়।
হাহাকার নিয়ে ওকে মুক্ত করে দিয়েছিলাম এভাবে। আমার স্কুল জীবনে। ও বলতো আমাদের ছেলে হলে নাম রাখবো..... আর মেয়ে হলে নাম রাখবো......
হয়নি সত্য।।
 
 
★ লেখা : কতক বসন্ত
★ কলমে : বিষফল ( 22.08.21) 4.10 A.m.

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

প্রহসন

 

 
 
 

 
সিগারেট ধরিয়েছেন?
ফেলুন ওটা।
বিড়ি?
ওটাতো ৯০% কাঠের গুঁড়োতে ভরা।
আজ রাত ঘুমাবেন কি প্রকার?
জলের বোতলে গুলে নিন অশ্রু আমার।
হারাম মাংসে কামড় বসান,
আহ কি কটু গন্ধ অশ্রুময়।
জানেন ঈশ্বর,
এভাবে হুটহাট পৃথিবীতে রাত নামাবেন না।
ঠোঁটের চামড়া গুলো খোলস পাল্টায়,
নগ্ন শরীরগুলো ঢেকে নিন কাঁথায় ।
কি দারুন শিল্পময়,
সুঁতোর ফোঁড়ে শরীরময় কালপুরুষ গোটাকয়।
এই নিন, জলের বোতলে গুলে নিন অশ্রু আমার।
ছড়িয়ে দিন দেওয়ালময়,
মুত্রগন্ডি টানে পশু যেমন.....
আপনার চোখ আটকে গেলো তো আবার?
সারারাত জেগে চিড়িয়াখানায় পশুদের সঙ্গম দেখে এলাম।
ভোররাতে মমিটার কাছে গিয়ে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকলাম।
ওর শরীরজুড়ে কি গন্ধ, বমি পায়।।
মিউজিয়াম আপনি একটা বেজম্মা,
আপনার বুকে হৃদপিণ্ড কোথায়?
জলের বোতলে গুলে নিন অশ্রু আমার,
হারাম মাংসে কামড় বসান।
আহ কি কটু গন্ধ অশ্রুময় ।।
জানেন ঈশ্বর...
এভাবে হুটহাট পৃথিবীতে রাত নামাবেন না।
পটপট করে পুড়ে যাচ্ছে শ্মশানের কাঠ,
তীব্র চিৎকার করা বিড়ালটাকে ধরে
চিতার আগুনে পোড়ালাম।
ওটাই লেবু মাখিয়ে ডিনার সারবো আজ ।।
স্যার, আপনার সিগারেটটা দিনতো এবার।
রাতের নাভিতে কোন পুরুষ জন্মায় না,
রাতের নাভিতে কেবল শিৎকার শিৎকার।
গোটাকত জোনাকপোকা খুন করলাম,
ওদের আলোয় আপনি ঘুমান।
আমি ছাই তুলে তুলে চোখে লাগালাম।।
 
 
★ লেখা : প্রহসন
★ কলমে : বিষফল (28.09.21), 12.43 A.M.

 

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS