- গ্রন্থ মূল্যায়ন -

পাতা উল্টিয়ে লাইন পড়ে পড়ে কবিতার বই কেনা আমার চিরাচরিত অভ্যাস । কলকাতা বইমেলা ২০০৮
।
সেইরকম ভাবে কিনে ফেললাম “দ্রাঘিমা ও প্রত্নবালিকা” । “কৃপা বসু” কবির নাম
। নবীনা কবিরা এত অগ্নিসম্ভবা আরেকবার আঁচ পেলাম । প্রগতিশীল সমাজ
ব্রান্ডেড কর্মশালার গুঁটিকয় কবিতে সাহিত্যকে আবদ্ধ দেখে তৃপ্ত হয়।
চিরাচরিত প্রথা ভাঁঙা আমার অভ্যাস । তৃপ্তি দিল আমায় । প্রশংসা করতেই হয়
শব্দজাল - বিন্যাস ।
নবীনা চোখের দৃষ্টিতে যাদের দুঃক্ষ বেদনা
কবির লেখায় ধরা দেয় যেভাবে, “চিঠির ঘর বুনতে বুনতে ডাকবাক্স দের চোখে ঢুকে
গ্যাছে চোরাবালি । / বহুকাল হল তারা হাসতে ভুলেছে।”
আর সেই সঙ্গে কবি কৃপা বসু জানান দেয় দৃপ্ত ঘোষনায়, “আসলে আমাদের জীবনে একটা নিরামিষ আয়নার বড়ই দরকার” ।
শব্দ চয়ন করতে গিয়ে তিনি জানান দেন, “অফিসের টিফিন ব্রেকে প্রিয় কবিতার
কাছে এসে বসি মিনিট দশেক মতো, / আখরভান্ড ভেঁঙে শব্দ্সাজাই”।
কখনও প্রচন্ড আহ্লাদে , “বাথটবের সাবানজলে যে প্রেমিক পুরুষ শুয়ে থাকে সরস দৃষ্টি নিয়ে, / ফেনায়িত আদর মাখি তার চুপচাপ” ।
আর কবির ভূল হলে যা করেন অকসাৎ, “অবাধ্য চুল ভেবে পুড়িয়ে ফেলি জানালার পর্দা । / বুকের খনিজে বাড়ে নুনের পরিমান” ।
পরকীয়ার ইসারায় কবি কন্ঠে উচ্চারিত হয়, “পালতোলা নৌকার মত / ফুলে ফেঁপে
ওঠা প্রতিশ্রুতির বাকল ঝুপ ঝুপ ভাঙে ঘষা জানালার কাঁচে” । কিম্বা, “কাঁচের
রেকাবিতে তুলে রাখা / ঝাঁঝালো প্রেম যাকে পরকীয়া বলো তুমি, / তার চিবুকে
এঁকে দিই সস্তার চুম্বন” । অনুভূতির জোয়ারে কবি কন্ঠে ধ্বনিত হয়, “এঁটো
হাতে চেপে ধরি বিবিক্ত ঠোঁট , ধারালো দাঁতে কেটে ফেলি চাঁদের / চিকন সুতো” ।
“
আর দু চোখে, “স্পষ্ট দেখি নকশাওয়ালা চাদরের ফাঁকে ওর নাভিমূল
বেয়ে চুইয়ে পড়ে / কবিতার আখর” । কিম্বা , “আর আমি ঘ্রান নিই, মজে যাই ছিঁড়ে
যাওয়া / ঘুঙুরের শোকে” ।
অমর রহে কবির “শিমুলবালা” ধরায় । সত্যি এ
এক রহস্যময়ী নারী, উচ্চারিত হয় , “সস্তা জামার বোতামে দুখিযালি নদী বেঁধে
রাখি । সম্পর্কের কাঁটাতার / পেরিয়ে বটের পাতায় বৃষ্টি ধরে রাখাই আমার
স্বভাব” । / ছুঁতে যাই ছুঁতে যাই কুসুমিত পড়সিবাগান । / ভয় নেই ভয় নেই
ক্যাকটাসও মাটির সন্তান” ।
কবির চোখে সঙ্গম যে ভাবে ফুটে ওঠে,
“গোটা শরীর জুড়ে / মীনকুমারীর কদম ফোটে, নিঃশ্বাস ভারি হয় বাতাসে বাতাসে”।
কিম্বা, “সংসার ও শ্মশানের মাঝে এক ক্লোরোফিল দূরত্ব, ফুঁ দিয়ে তারা সাঁকো
/ তৈরি করে” ।
এক অন্য পূজোর বর্ননায় কবি কন্ঠে ধ্বনিত হয়, “মুঠো
মুঠো ফুল ছুঁড়ে দিচ্ছে ঈশ্বরীর মুখ লক্ষ্য করে । পুষ্ট / টইটুম্বুর স্তন
বেয়ে ঝরে পড়ছে ফুল , শুয়ে থাকা বলিষ্ট অসুরের গায়ে” ।
ভীত হন না কোন
সত্য দৃশ্য চয়নে , তাই তার চোখে এটাও ধরা দেয়, “অনেকখানি নিঃসব হলে
কবিতারা / চুঁইয়ে পড়ে ব্রহ্মহস্ত থেকে ধুলোর কাগজে,” ।
এছাড়া
স্ফুলিঙ্গ থেকে পাওয়া যায়, “চোখের অতলান্ত গভীরে বাদাম রঙের সুবিশাল
দেওয়াল, টাঙানো তাতে / অজস্র মিউরাল, রাজনৈতিক স্লোগান” । আর , “নুনের বাটি
থেকে ছেঁকে তুলি স্নেহরঙের জল । / অসুস্হ কুকুরের মতো ধুঁকতে থাকা শহরের
পোস্টমর্টেম করে পুরুষ্ট ঈশ্বর” । কিম্বা, “বিধর্মী রক্তের নোনা স্রোতে
ভেসে যায় আব্রুহীন দুপুর –বারান্দা “ ।
পিতৃত্বের সংজ্ঞায় জানান দেয় , জন্মাবধি দেখা প্রথম শিল্পী বা অহংকারী ঈশ্বরও বলা যায়” ।
আর যেটা বিশ্বাদের, “গতরাতে ভূগোলের মাস্টার / তার ঠোঁট চটে খেয়েছিল । / আমার একটি মেয়ে ছিল “আলো” / এখন নেই” ।
শীত এলে কবির তুলি আঁচড় দেয়, “টুটাফুটা শীতের একটা পুরুষালি রূপ আছে, ঠিক যেমন ভাব ও / আখরের বানিজ্য করে ফেরা ইনসিকিওরড সওদাগর” ।
কবির
প্রত্নবালিকা যেভাবে সংসারে আবদ্ধ হয়, “একদিন মেয়েটি সংসার মেখেছিল গোটা
গায়ে, স্নেহের সাবান ঘষে ঘষে” । কিম্বা, “প্লেকট্রাম হারিয়ে ফেলা প্রতিটা
বসন্তই আসলে, / পাখি হয়ে উড়ে যায় অন্য আকাশের ছাদে” ।
কবির চোখে
অনুভূতির আরেক ছোঁয়া, “আমিষ কলবরের প্রিয় বুকপকেটে রাখা গুপ্ত কথাদের শুকনো
খোলস / ছাড়ালে, ভেতরে যে তুলতুলে অংশটা / তাকে অনুভূতি বলে, ধিকিধিকি
পুড়তে থাকে । বোকারা তাকে দুই / ঠোঁটের মধ্যবর্তী স্থানে শোয়া নিছক শব্দ
মনে করে” । কিম্বা , ভাঙা পুতুলের মতো আমরা যেমন আদুরে তেমনই ইনসিকিওরড । /
দস্তানার ভিতর বন্দুক নয় আঙুলে পেঁচানো বেলফুলের মালা, জুতোর / মধ্যে
বিস্ফোরক নেই, শুকনো গোলাপ আছে রাখা, পাউরুটির পেটে / বারুদ নয় আলুর
ঝাঁঝালো মশলা ভরা” ।
কবি নগ্ন খিদেকে যে ভাবে তুলে ধরে, “আব্রুহীন
কাঠের গায়ে বাজে কুঠারের নূপুর । / শানিয়ে নেওয়া ঈশ্বরের জিভে জেগে ওঠে
প্রিয় হরিণীর স্বাদ” ।
আর সন্ধানি কবি দু চোখে দেখে কূল না পেলে
উচ্চারন করে, “হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকের খোঁজে যেসব চিঠিরা চুল খুলে দেয়
জানালার গ্রিলে, / তাদের নির্দিষ্ট কোনও ডাকবাক্স থাকে না” । আর পরিনতীতে,
“যৌবন রঙ স্তনে মেখে কুসুমবালা চিলেকোঠার টব থেকে উঠে বাগানের / মাটিতে
বসেছে দু হাত ছড়িয়ে” ।
আর নিরবে বিড়বিড় করে, “আমার শুধু ভেসে যাওয়াটুকু
আছে, ফেরার ঠিকানা হারিয়েছি বহু আগে” । তবুও মায়া জন্মায়, প্রাক্তন
প্রেমিকের তরে, “শিকারী আলোর হলদে জানালার নীচে এক কৃষ্ণকায় হৃষ্টপুষ্ট
পুরুষ লাল / নীল সবুজ চুড়ি বিক্রি করে । তার ইস্পাত কঠিন বুক থেকে ছিটকে /
আসে ছাতিম ফুলের নরম ঘ্রাণ । / ভীষন ইচ্ছে হয় কোনও এক গ্রীষ্মের দুপুরে,
পিঁড়ি পেতে শাকান্ন রেঁধে / তাকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে” ।
অতীতটা বারবার হানা দেয়, “কথা ছিল পার্সিয়ান ব্ল্যু হয়ে একে অপরের দেওয়ালে লেপটে থাকার” ।
প্রতিটা
প্রেম, প্রেমিক, প্রেমিকা যেমনটি হয়, “সে একাধারে আমার মেয়ে, স্ত্রী, মা,
আমার প্রেমিকাও বটে, ও / আমার সরসীবালা । বল্কল ত্যাগ করে কিরাতের মতো ফিরে
আসি ময়লা / কুঠিরে” । তাই, “এক একটা মুহূর্ত দীর্ঘ হয়ে আসে যেমন সন্তান
প্রসবের আগের / রাত” । কিম্বা, “কফির টেবিলে আমরা সমুদ্র আঁকি, অথচ
বহ্নিপাঁজরে যে / স্বচ্ছতোয়া নদী কলকল করে বয়ে যায় আব্রুহীন কাঁটাতার
ছুঁয়ে, তার / খোঁজ কি কেউ রাখে ?”
বাজে অবক্ষয়ের বাজনা, “নিখোঁজ
হওয়ার আগে প্রতিটা চিঠির ঠোঁট থেকে মুছে যায় / প্রেমিকের ঘ্রাণ । রোদ গিলে
খাওয়া লেপের রোঁয়ায় জলের যে দাগ লেগে / থাকে তা আসলে একপ্রকার অবক্ষয়” ।
বাঁচার
আহ্বান যেভাবে ধরা দেয়, “সোনালি ধানক্ষেতের পাশে শোয়া ছাইরঙা খাল, উপর
দিয়ে বয়ে চলে / সন্ন্যাসী হাওয়া” । কিম্বা, “আসলে মা বুঝিয়ে দিয়েছে কেমন
করে মানিয়ে নিতে হয়, আধসিদ্ধ / ডিমের নরম কুসুমের মতো” । তাই কবি যেভাবে
ধরা দেয়, “ অনেকখানি ক্লান্ত হলে প্রিয় কবিতার কাছে নগ্ন হই” । আর আহ্বান
করেন, “এসো আগুন এসো ছুঁইয়ে দাও তোমার প্রসাদী ফুল আমার কপালে” ।
ইন্দ্রিয়কে
সজাগ করতে কবি লিখে ফেলেন, “ এই যে ব্লেডরঙের আকাশ প্রতিদিন একটা করে
বিধবা চাঁদ চিরে ফেলে / কখনও তার নিরীহ শীৎকার শুনেছেন ? / পা বেয়ে চুঁইয়ে
পড়ে রজঃস্রাবের লাল, অথচ গোটা শরীর মন জুড়ে / মেয়েটিকে বন্ধ্যা হতে
দেখেছেন ?”
সম্পর্কে তিনি দেখেন, “ওর ভিজে সপসপে গা বেয়ে / গড়িয়ে
পড়ে বীজভাঙা নোনা পানি । আমি মুখ ডুবিয়ে টাটকা মাছের গন্ধ / শুঁকি” ।
সঙ্গমি নারি কন্ঠে তুলে দেন যে বানী, “বৈধতার বল্কল খসিয়ে পারদের মতো
ওঠানামা করি ওর জিভের / গভীরে” । কিম্বা, “নারীজন্মের সমস্ত গোপন কথার
পান্ডুলিপি ফাঁস হয়ে / যাক ওর সম্মুখে । ঈশ্বরের বর্ম ভেদ করে প্রকৃত
প্রেমিক হয়ে উঠুক” ।
এত সম্ভবনা কি হেলায় ফেলবার , হে নবীন কবিদল,
পাঠক সমাজ ? কবি কৃপা বসুর “ দ্রাঘিমা ও প্রত্নবালিকা” ঠাঁই পাক সেইসব
বোদ্ধা মননশীল কবি পাঠকের হাতের তালুমুদ্রায় । নিরীহ আমি তো দেখলাম, এবার
আপনার পালা ।
* গ্রন্থ দৃষ্টিপাতে = বিষফল