RSS
কবি, লেখক, সমালোচক, বাচিক শিল্পী, গল্পকার, মানবতাবাদী, নাস্তিক, যাদুকর
Showing posts with label গ্রন্থ মূল্যায়ন. Show all posts
Showing posts with label গ্রন্থ মূল্যায়ন. Show all posts

 

   

 


 - গ্রন্থ মূল্যায়ন -


জীবন যন্ত্রণায় বিদ্ধ হলে কলমও যে কত তীব্র হাহাকারে ফেটে পড়ে তার উৎকৃষ্ট সনদ : কবি হুমায়ুন রসিদের কাব্য গ্রন্থ "অথবা মৃত্যুচুম্বন"।
এটি কোন নিছক বই নয়, একটা গোটা জীবনের নির্জাসিত যন্ত্রনা, প্রতিবাদ, স্পর্ধায় ঠাসা এক তাজা অমূল্য সমাহার ।
পাতা ওল্টালাম.... স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। সূচিপত্রের আগের পাতা খানি একরাশ কথা ঘোষনা দেয়: " যাঁরা আমায় অক্ষর চিনিয়েছেন - সাজিদুল হক ও আসমা বিবি "। সূচনা অনেক কিছু জানান দেয়।
কবিবর লকডাউনে যে আর্তনাদে ফেটে পড়েন - " রাষ্ট্রের যাঁতাকলে আমরা/ থেঁৎলে যাচ্ছি হঠাৎ-ই মৃত্যু ভালোবেসে মরে যাচ্ছি"।
পরক্ষণেই তর্জনি তুলে সূচিত করে- " একটি কালো সময়ের ভিতর/ গড়িয়ে যাচ্ছে সভ্যতার দিকভ্রান্ত চাকা"। কিম্বা " প্রতিটি ঘূর্ণন রেখে যাচ্ছে / নীল যন্ত্রণার ব্যর্থ পদচ্ছাপ"। আর " রাত্রির জঠরে ঘুমিয়ে আছে শতছিন্ন নদী"।
তারপরেও মাথা তুলে কম্পিত গলায়: " জিঘাংসার অগ্নিস্রোত চিরে চিরে/ আমরা একদিন নিয়ে আসতে পারবো/ রক্তিম নক্ষত্রের আলোর ছাঁট"?
ফেরার ডাকে কবি অবিচল : " কাকভেজা রাত পেঁচার মতো ফেরো/ এখন ফেরো যেকোন সময়/ গোপনে সংগোপনে অথবা প্রকাশ্যে / যেভাবে হোক ফেরো/ শুধু ফেরো শুধু ভালোবাসো একবার/ বন্ধহোক বুকের রক্তক্ষরণ "। তৃষিত হৃদয়ে বিশুদ্ধ ভালোবাসার বর্ষনই কাম্য। সে আহ্বানে নারী না প্রকৃতি কিম্বা ঝঞ্ঝাহীন বিশ্ব তা ছাপিয়ে যায়।
চোখ চলে যায় বাতানুকূল ঘরের বারান্দায়। উচ্চারিত হয়: "হিংস্র সারমেয় নির্মানে অক্ষম/বালি-সিমেন্টে মেশাতে পারে না রক্ত-ঘাম"। আর ওদিকে " সামান্য বৃষ্টিতে বারে বারে ভিজে যায় বাবুই-যের বাসা" । কিভাবে? তাও কবি ছবি দিলেন : " দগ্ধ জঠরের বিবর্ণ যন্ত্রণার দীর্ঘশ্বাসে"।
এ এক অন্য রকম বেঁচে থাকার ইতিবৃত্ত বটে। বলে ওঠেন : " স্বপ্নে চোখ মেলে দ্যাখো একবার/ বুকের জমিনে প্রস্ফুটিত স্বপ্ন"।
তাই তো তিনি বলতে পারেন একমাত্র, " হে প্রিয়তমা / বুকের রক্তপিয়ালি বয়ে যায় যাক/শুধু একবার স্বপ্নে দ্যাখো নিতান্ত ভুলবশত"। কিম্বা " শুধু একবার স্বপ্নে দ্যাখো নিতান্ত ভুলবশত / সিগারেটের ধোঁয়ায় বুকের পোড়া রক্ত"।
পরক্ষনে আর্তনাদ ছাপিয়ে ককিয়ে ওঠেন: " বাঁচতে চাও বাঁচো/ অথবা মৃত্যুচুম্বন/ লড়তে চাও লড়ো/ নতুবা দাসত্ব / আর কে না জানে দাসত্ব একটি মৃত্যুচুম্বন"। তিক্ষ্ণ চয়ন। কিম্বা " বাঁচতে চাও বাঁচো/বাঁচো বাঁচো এবং বেঁচে থাকো/ অথবা মৃত্যুচুম্বন"। সত্যি শিহরণময়। তীব্র যন্ত্রণা থেকে যে নিদারুণ চাওয়া উঠে আসে কলমে: "আমার কবরে থুতু ফেলো থুঃ থুঃ করে"। তবেই ঘটবে কবির শান্তিময় ঘুম নিরব। "এখন এইটুকুই তো চাওয়া" কবির কথায়।
কেননা ফ্যাসিবাদী চেয়ার দখলে : "বৃষ্টির গুঁড়োর মতো গুঁড়ো হচ্ছে জীবন/প্রতিরোধহীন পিঁপড়ের মতো/চুরচুর হয় স্বপ্ন/গুঁড়ো স্বপ্ন তরঙ্গের গর্ভে জন্ম হয় স্বপ্ন /এভাবেই এগিয়ে চলে জীবন"।
সেক্ষেত্রে জীবন : আলপথ থেকে আলপথ/ প্লাটফর্ম থেকে প্লাটফর্ম / যেভাবে ক্ষুধার্ত কুকুর/উঠোন থেকে উঠোন/ গ্রাম থেকে গ্রামান্তর / হন্যে হয়ে খোঁজে একমুঠো উচ্ছিষ্ট"।
সত্যিই জর্জরিত, নিশ্চিহ্ন হবে মানবতা ক্রমশ নয়তো।
কবি নিথর নিরালায় বসে ডাক দেন : "আমাকে যদি খোঁজ কোনদিন /মেঘেদের পাহাড়ে সন্ধ্যাতারার দিকে/পাবে না"। কিম্বা "আমাকে যদি খোঁজো কোনদিন / অববাহিকায় ঠিকরে পড়া অরণ্য চন্দ্রিকায়/সুবর্ণরেখা, মাতলার স্রোতে/পাবে না"। আর, " বসন্ত পলাশের নির্যাসে আকন্ঠ/আড় বাঁশি হাতে রকে বসা কিশোর দলে/ পাবে না"।
কারন, "কি করে পাবে বলো/আমি তো রাত্রির ধারলো কিনারায়"।
পরক্ষনে তীব্র রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে গর্জে উঠে সজাগ করেন : " যে কোন সময় লালনের মাটি দখল নেবে/হিংস্র হায়নার দল/তার লকলকে জিহ্বায় গেরুয়া গরল"।
আর সূচিত করেন বিপ্লবী জবাবে, "এ মাটিতে কবর খুঁড়বো হিংস্র হায়নার"। বলো রুখে দাঁড়াবার সত্যি সময় এলো।
" অবেলায় বুকে বুকে জাপ্টে থাকা পার্ক" কেও কড়কে জানান: " সব ফাঁস করে দেবো/আনমনে বসে থাকা ইস্টিশন/ব্যাগ ভর্তি না-দেওয়া চিঠি/বুক ভর্তি স্বপ্ন/গরম শ্বাস-প্রশ্বাস"।
অথচ যখন : "শ্রেনি বৈষম্য ছুঁয়ে ফেলে আকাশ", তখন " তুমি আমি বসে আছি বাল-গোধূলির পাড় ঘেঁসে/এমন সময় ভোজ্য তেলের দাম বাড়ে"। কি নিদারুণ শব্দাঙ্কন সব।
আর " ভোটে জিতে সে কী উল্লাস/ যেনো শুয়োরের গর্জন"।
হাহাকার যার গতিময়তা সে তো উচ্ছারনে জানান দেয়, " যে প্রেমে পুড়েছে হৃদয়/সে প্রেম কেনো আসে বার বার?/আমি তো চাইনি"। চরম বাস্তব সত্য বরাবর। প্রেম কষ্টের বাহন হয়েও অমৃতের দাবীদার।
তাই কবি বলে ওঠেন, " আরো একটি মৃত স্বপ্নের ভেতর/ স্বপ্ন-পোড়া আগুন ছুটে যায় প্রজন্মান্তর "। ঠিক এভাবেই ভাগচাষীর কান্না ব্যক্ত হয়।
প্রেয়সীর আত্মসমর্পণ এর ডাকে সূচিত হয়, " বলো সংসার-সংসার খেলায়/রক্তবমি উঠেছে তোমার গলা অবধি/ বলো ভুল খেলায় ছিন্নভিন্ন জীবন"।
চিরন্তন বন্দি প্রেমহীন সংসারের চিত্র এ এক ভীষণ ।
তাই কবি যেটা করেন, " সোনাগাছির গলি পথে হাঁটি/ একা একা হেঁটে যাচ্ছি কবরবাড়ি"। কিম্বা, " আমার পথের চৌদিকে ফুটে উঠছে প্রাক্তন ছায়া/বুকের ভেতর আছাড় খাচ্ছে মায়া"। আর, " মাতাল ঝড়ের অন্তরীক্ষে হেঁটে যাচ্ছি /চোখের রক্তে নিচ্ছি ইস্পাত শপথ"।
আর একে একে চোখে পড়ে, "ধ্বসে পড়া বালুস্তুপের মতো/ ক্ষয়ে যাচ্ছে সভ্যতার পাঁজর/মানুষ আর মানুষের মাঝে দীর্ঘতর হচ্ছে প্রাচীর"। আর সেসময়, " কুড়ি টাকায় ভাড়া খাটে সুস্থ যোনি আর/রাষ্ট্র ঘোষণা দেয় গরুর মূল্য "। কিম্বা তখন, " ধর্ম গৃহের দেওয়ালে সাঁটা হয় মোজাইক পাথর"।
নিখুঁত চোখে এড়িয়ে যায় না একচুলও বাস্তব গোপন চিত্রও কোনো। স্যালুট তাই সময়োপযোগী কাব্যে বিশ্লেষণ "অথবা মৃত্যুচুম্বন"।
" হাঁটতে হাঁটতে সন্ধে নামে পাড়ায় পাড়ায়/ হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়ে / সংসার-সংসার খেলায়"। বছর দশেকের একটা পেপসিঅলা।
চরম বেদনায়, " ঘুম ভাঙা মধ্যরাতে/এখনো আঁকো নেমে আসা বিকেল?" কিম্বা " বিলাপে বিলাপে পার হয় বুঝি জন্ম-জন্মান্তর"।
দ্রোহের কলমে যখন শানিত হয়, " কোন আগুনে পোড়ে না/রফিক সালাম বরকত জব্বারের রক্তমাখা জামা/পৃথিবীর কোন পুঁজিপতি কোন বেনিয়ার ক্ষমতা নেই/ একটি রক্তমাখা জামা কিনবার"। আর, "মৃত সূর্যের ভিতরেও পত্ পত্ উড়বে/ অ-আ-ক-খ খচিত একটি রক্তমাখা জামা"।
সত্যি এ লাইন গুলো সময়ের কাছে অমরত্বের দাবিদার।
কিম্বা চরম হতাশায়, "ভালোবাসায় বাঁধবো কাকে?/কোন হাতে রাখবো হাত?/সবাই হাত ছেড়ে দিচ্ছে "।
তাই উচ্চারিত হয়, " আমার কবিতা শ্মশানের ছাই ভস্ম খায়/আমার কবিতা বিদ্রোহে ক্ষিপ্রতায়/ছুড়ে দেয় মুষ্টিবদ্ধ হাত"।
কিম্বা, "আমার কবিতা ডাহুকের সুরতিথি লিখে রাখে/ইতিহাসের পাতায় পাতায়"।
পুরো কাব্যজুড়ে পরতে পরতে অসামান্য শব্দের বিন্যাস, চিত্রকলা এক এক । সৃষ্টি আর সৃষ্টিতে সমৃদ্ধ হয়েছে।
জেলেজীবন এর চিত্রে, " সাপের ফণার মতো ঢেউ ভেঙে ভেঙে/খুঁটে আনে পেট-খোরাক"। কেমনা, " এখানে জীবন/ প্রজন্মান্তর জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায়"।
কবির ক্লান্ত শরীর যখন বিছানায়, " চোখে চোখ রাখলে/ কিঞ্চিত স্পর্শ দিলে/ মুহুর্তেই তোমার চোখ কোকনদ,অর্ধনিমীলিত "।
তাই কবি উচ্চারণ করে, " গ্যারান্টি দিতে পারি আমার ওষুধ সেবনে/নিশ্চিত রোধ হবে তোমার ভাঙন"।
স্রষ্টা তো এমনই হয়, " আমি পথিক অথচ/ আমার কোন পথ নেই"।
অথচ কেবল ভাতের জন্য, " যা ইচ্ছা তাই করতে পারি/সীমান্তে কাঁটা তারে লাগাতে পারি আগুন"। কিম্বা, " আমার পেটে ক্ষিদে থাকলে/খেয়ে ফেলতে পারি/মন্দির - মসজিদ-গীর্জার মোজাইক পাথর"। " স্রেফ একমুঠো নুন-ভাতের জন্য /করতে পারি বিশ্বব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ "।
কেননা, " ক্ষুধার্ত মানুষের কেউ নেই/তুমি নেই রাষ্ট্র নেই কেউ নেই"।
সেখান থেকে ডাক দেন, "তীব্র অভিমানে বসে আছো বিষন্ন রাত্রির মতো একা/অঝোরে বৃষ্টি দুচোখে তোমার/তবু তুমি ফিরে আসবে না?"
কিম্বা "সব পাখি জানে গাঢ় গোধূলি তলিয়ে যায়/অথৈ তমিস্রায়/তুমি জানো না?"
তাই, " গোলাপের নাভিতে রাখি ঠোঁট/সাধ মেটেনা তাও"। আর, "বুকের অন্তরীক্ষে আষ্টেপৃষ্টে জাপ্টে ধরি নগ্ন মূর্তি /স্তনবৃন্তে রাখি তৃষ্ণার্ত ঠোঁট/সাধ মেটেনা তাও"।
তাই, " নির্জন টিলার পরে বসে/নিজেরই ছায়াকে দিই পূজো"।
আর ঘোষণা দেন, " হে জীবন/নিয়মতান্ত্রিক শিকল খুলে দিলাম"। আর বসন্তের আবাহনে, " রোদ-পোড়া কৃষকের নোনতা ঘামের/দুঃখ নিতে দাও"।
তোমার স্তনবৃন্ত ও নাভীর গভীরে ওষ্ঠচ্ছাপ/অক্ষরে অক্ষরে কবিতায় এঁকে/ আমি নিঃস্ব ও নষ্ট হতে চাই"। কেননা, " আমি তো নষ্ট হতে চেয়েছি বার বার"।
বিষাদ যন্ত্রণা গাঁথার পরতে পরতে অসামান্য সৃষ্টির গাঁথুনি আমি তো দেখলাম। মুগ্ধ হলেম চরম এক স্রষ্টার লেখমালায়। সত্যি, সাহিত্যসৃষ্টি আর বন্দি থাকবে না এলিট মিডিয়া ভিত্তিক।
 
 

★ গ্রন্থ দৃষ্টি পাতে : বিষফল (13.09.21)

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

 

   

       - গ্রন্থ মূল্যায়ন -





পাতা উল্টিয়ে লাইন পড়ে পড়ে কবিতার বই কেনা আমার চিরাচরিত অভ্যাস । কলকাতা বইমেলা ২০০৮
। সেইরকম ভাবে কিনে ফেললাম “দ্রাঘিমা ও প্রত্নবালিকা” । “কৃপা বসু” কবির নাম । নবীনা কবিরা এত অগ্নিসম্ভবা আরেকবার আঁচ পেলাম । প্রগতিশীল সমাজ ব্রান্ডেড কর্মশালার গুঁটিকয় কবিতে সাহিত্যকে আবদ্ধ দেখে তৃপ্ত হয়। চিরাচরিত প্রথা ভাঁঙা আমার অভ্যাস । তৃপ্তি দিল আমায় । প্রশংসা করতেই হয় শব্দজাল - বিন্যাস ।


নবীনা চোখের দৃষ্টিতে যাদের দুঃক্ষ বেদনা কবির লেখায় ধরা দেয় যেভাবে, “চিঠির ঘর বুনতে বুনতে ডাকবাক্স দের চোখে ঢুকে গ্যাছে চোরাবালি । / বহুকাল হল তারা হাসতে ভুলেছে।”

আর সেই সঙ্গে কবি কৃপা বসু জানান দেয় দৃপ্ত ঘোষনায়, “আসলে আমাদের জীবনে একটা নিরামিষ আয়নার বড়ই দরকার” ।

শব্দ চয়ন করতে গিয়ে তিনি জানান দেন, “অফিসের টিফিন ব্রেকে প্রিয় কবিতার কাছে এসে বসি মিনিট দশেক মতো, / আখরভান্ড ভেঁঙে শব্দ্সাজাই”।

কখনও প্রচন্ড আহ্লাদে , “বাথটবের সাবানজলে যে প্রেমিক পুরুষ শুয়ে থাকে সরস দৃষ্টি নিয়ে, / ফেনায়িত আদর মাখি তার চুপচাপ” ।

আর কবির ভূল হলে যা করেন অকসাৎ, “অবাধ্য চুল ভেবে পুড়িয়ে ফেলি জানালার পর্দা । / বুকের খনিজে বাড়ে নুনের পরিমান” ।

পরকীয়ার ইসারায় কবি কন্ঠে উচ্চারিত হয়, “পালতোলা নৌকার মত / ফুলে ফেঁপে ওঠা প্রতিশ্রুতির বাকল ঝুপ ঝুপ ভাঙে ঘষা জানালার কাঁচে” । কিম্বা, “কাঁচের রেকাবিতে তুলে রাখা / ঝাঁঝালো প্রেম যাকে পরকীয়া বলো তুমি, / তার চিবুকে এঁকে দিই সস্তার চুম্বন” । অনুভূতির জোয়ারে কবি কন্ঠে ধ্বনিত হয়, “এঁটো হাতে চেপে ধরি বিবিক্ত ঠোঁট , ধারালো দাঁতে কেটে ফেলি চাঁদের / চিকন সুতো” ।

আর দু চোখে, “স্পষ্ট দেখি নকশাওয়ালা চাদরের ফাঁকে ওর নাভিমূল বেয়ে চুইয়ে পড়ে / কবিতার আখর” । কিম্বা , “আর আমি ঘ্রান নিই, মজে যাই ছিঁড়ে যাওয়া / ঘুঙুরের শোকে” ।

অমর রহে কবির “শিমুলবালা” ধরায় । সত্যি এ এক রহস্যময়ী নারী, উচ্চারিত হয় , “সস্তা জামার বোতামে দুখিযালি নদী বেঁধে রাখি । সম্পর্কের কাঁটাতার / পেরিয়ে বটের পাতায় বৃষ্টি ধরে রাখাই আমার স্বভাব” । / ছুঁতে যাই ছুঁতে যাই কুসুমিত পড়সিবাগান । / ভয় নেই ভয় নেই ক্যাকটাসও মাটির সন্তান” ।

কবির চোখে সঙ্গম যে ভাবে ফুটে ওঠে, “গোটা শরীর জুড়ে / মীনকুমারীর কদম ফোটে, নিঃশ্বাস ভারি হয় বাতাসে বাতাসে”। কিম্বা, “সংসার ও শ্মশানের মাঝে এক ক্লোরোফিল দূরত্ব, ফুঁ দিয়ে তারা সাঁকো / তৈরি করে” ।

এক অন্য পূজোর বর্ননায় কবি কন্ঠে ধ্বনিত হয়, “মুঠো মুঠো ফুল ছুঁড়ে দিচ্ছে ঈশ্বরীর মুখ লক্ষ্য করে । পুষ্ট / টইটুম্বুর স্তন বেয়ে ঝরে পড়ছে ফুল , শুয়ে থাকা বলিষ্ট অসুরের গায়ে” ।

ভীত হন না কোন সত্য দৃশ্য চয়নে , তাই তার চোখে এটাও ধরা দেয়, “অনেকখানি নিঃসব হলে কবিতারা / চুঁইয়ে পড়ে ব্রহ্মহস্ত থেকে ধুলোর কাগজে,” ।

এছাড়া স্ফুলিঙ্গ থেকে পাওয়া যায়, “চোখের অতলান্ত গভীরে বাদাম রঙের সুবিশাল দেওয়াল, টাঙানো তাতে / অজস্র মিউরাল, রাজনৈতিক স্লোগান” । আর , “নুনের বাটি থেকে ছেঁকে তুলি স্নেহরঙের জল । / অসুস্হ কুকুরের মতো ধুঁকতে থাকা শহরের পোস্টমর্টেম করে পুরুষ্ট ঈশ্বর” । কিম্বা, “বিধর্মী রক্তের নোনা স্রোতে ভেসে যায় আব্রুহীন দুপুর –বারান্দা “ ।
পিতৃত্বের সংজ্ঞায় জানান দেয় , জন্মাবধি দেখা প্রথম শিল্পী বা অহংকারী ঈশ্বরও বলা যায়” ।
আর যেটা বিশ্বাদের, “গতরাতে ভূগোলের মাস্টার / তার ঠোঁট চটে খেয়েছিল । / আমার একটি মেয়ে ছিল “আলো” / এখন নেই” ।

শীত এলে কবির তুলি আঁচড় দেয়, “টুটাফুটা শীতের একটা পুরুষালি রূপ আছে, ঠিক যেমন ভাব ও / আখরের বানিজ্য করে ফেরা ইনসিকিওরড সওদাগর” ।
কবির প্রত্নবালিকা যেভাবে সংসারে আবদ্ধ হয়, “একদিন মেয়েটি সংসার মেখেছিল গোটা গায়ে, স্নেহের সাবান ঘষে ঘষে” । কিম্বা, “প্লেকট্রাম হারিয়ে ফেলা প্রতিটা বসন্তই আসলে, / পাখি হয়ে উড়ে যায় অন্য আকাশের ছাদে” ।

কবির চোখে অনুভূতির আরেক ছোঁয়া, “আমিষ কলবরের প্রিয় বুকপকেটে রাখা গুপ্ত কথাদের শুকনো খোলস / ছাড়ালে, ভেতরে যে তুলতুলে অংশটা / তাকে অনুভূতি বলে, ধিকিধিকি পুড়তে থাকে । বোকারা তাকে দুই / ঠোঁটের মধ্যবর্তী স্থানে শোয়া নিছক শব্দ মনে করে” । কিম্বা , ভাঙা পুতুলের মতো আমরা যেমন আদুরে তেমনই ইনসিকিওরড । / দস্তানার ভিতর বন্দুক নয় আঙুলে পেঁচানো বেলফুলের মালা, জুতোর / মধ্যে বিস্ফোরক নেই, শুকনো গোলাপ আছে রাখা, পাউরুটির পেটে / বারুদ নয় আলুর ঝাঁঝালো মশলা ভরা” ।

কবি নগ্ন খিদেকে যে ভাবে তুলে ধরে, “আব্রুহীন কাঠের গায়ে বাজে কুঠারের নূপুর । / শানিয়ে নেওয়া ঈশ্বরের জিভে জেগে ওঠে প্রিয় হরিণীর স্বাদ” ।

আর সন্ধানি কবি দু চোখে দেখে কূল না পেলে উচ্চারন করে, “হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকের খোঁজে যেসব চিঠিরা চুল খুলে দেয় জানালার গ্রিলে, / তাদের নির্দিষ্ট কোনও ডাকবাক্স থাকে না” । আর পরিনতীতে, “যৌবন রঙ স্তনে মেখে কুসুমবালা চিলেকোঠার টব থেকে উঠে বাগানের / মাটিতে বসেছে দু হাত ছড়িয়ে” ।
আর নিরবে বিড়বিড় করে, “আমার শুধু ভেসে যাওয়াটুকু আছে, ফেরার ঠিকানা হারিয়েছি বহু আগে” । তবুও মায়া জন্মায়, প্রাক্তন প্রেমিকের তরে, “শিকারী আলোর হলদে জানালার নীচে এক কৃষ্ণকায় হৃষ্টপুষ্ট পুরুষ লাল / নীল সবুজ চুড়ি বিক্রি করে । তার ইস্পাত কঠিন বুক থেকে ছিটকে / আসে ছাতিম ফুলের নরম ঘ্রাণ । / ভীষন ইচ্ছে হয় কোনও এক গ্রীষ্মের দুপুরে, পিঁড়ি পেতে শাকান্ন রেঁধে / তাকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে” ।

অতীতটা বারবার হানা দেয়, “কথা ছিল পার্সিয়ান ব্ল্যু হয়ে একে অপরের দেওয়ালে লেপটে থাকার” ।

প্রতিটা প্রেম, প্রেমিক, প্রেমিকা যেমনটি হয়, “সে একাধারে আমার মেয়ে, স্ত্রী, মা, আমার প্রেমিকাও বটে, ও / আমার সরসীবালা । বল্কল ত্যাগ করে কিরাতের মতো ফিরে আসি ময়লা / কুঠিরে” । তাই, “এক একটা মুহূর্ত দীর্ঘ হয়ে আসে যেমন সন্তান প্রসবের আগের / রাত” । কিম্বা, “কফির টেবিলে আমরা সমুদ্র আঁকি, অথচ বহ্নিপাঁজরে যে / স্বচ্ছতোয়া নদী কলকল করে বয়ে যায় আব্রুহীন কাঁটাতার ছুঁয়ে, তার / খোঁজ কি কেউ রাখে ?”

বাজে অবক্ষয়ের বাজনা, “নিখোঁজ হওয়ার আগে প্রতিটা চিঠির ঠোঁট থেকে মুছে যায় / প্রেমিকের ঘ্রাণ । রোদ গিলে খাওয়া লেপের রোঁয়ায় জলের যে দাগ লেগে / থাকে তা আসলে একপ্রকার অবক্ষয়” ।
বাঁচার আহ্বান যেভাবে ধরা দেয়, “সোনালি ধানক্ষেতের পাশে শোয়া ছাইরঙা খাল, উপর দিয়ে বয়ে চলে / সন্ন্যাসী হাওয়া” । কিম্বা, “আসলে মা বুঝিয়ে দিয়েছে কেমন করে মানিয়ে নিতে হয়, আধসিদ্ধ / ডিমের নরম কুসুমের মতো” । তাই কবি যেভাবে ধরা দেয়, “ অনেকখানি ক্লান্ত হলে প্রিয় কবিতার কাছে নগ্ন হই” । আর আহ্বান করেন, “এসো আগুন এসো ছুঁইয়ে দাও তোমার প্রসাদী ফুল আমার কপালে” ।

ইন্দ্রিয়কে সজাগ করতে কবি লিখে ফেলেন, “ এই যে ব্লেডরঙের আকাশ প্রতিদিন একটা করে বিধবা চাঁদ চিরে ফেলে / কখনও তার নিরীহ শীৎকার শুনেছেন ? / পা বেয়ে চুঁইয়ে পড়ে রজঃস্রাবের লাল, অথচ গোটা শরীর মন জুড়ে / মেয়েটিকে বন্ধ্যা হতে দেখেছেন ?”

সম্পর্কে তিনি দেখেন, “ওর ভিজে সপসপে গা বেয়ে / গড়িয়ে পড়ে বীজভাঙা নোনা পানি । আমি মুখ ডুবিয়ে টাটকা মাছের গন্ধ / শুঁকি” । সঙ্গমি নারি কন্ঠে তুলে দেন যে বানী, “বৈধতার বল্কল খসিয়ে পারদের মতো ওঠানামা করি ওর জিভের / গভীরে” । কিম্বা, “নারীজন্মের সমস্ত গোপন কথার পান্ডুলিপি ফাঁস হয়ে / যাক ওর সম্মুখে । ঈশ্বরের বর্ম ভেদ করে প্রকৃত প্রেমিক হয়ে উঠুক” ।

এত সম্ভবনা কি হেলায় ফেলবার , হে নবীন কবিদল, পাঠক সমাজ ? কবি কৃপা বসুর “ দ্রাঘিমা ও প্রত্নবালিকা” ঠাঁই পাক সেইসব বোদ্ধা মননশীল কবি পাঠকের হাতের তালুমুদ্রায় । নিরীহ আমি তো দেখলাম, এবার আপনার পালা ।

 

 

* গ্রন্থ দৃষ্টিপাতে = বিষফল

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS

 

                                                                    

 

                                                                         - গ্রন্থ মূল্যায়ন -


পড়ছিলাম এক "অনু উপন্যাস"। পরতে পরতে এত টান টান সৃষ্টি-কাজ, এক বিরল নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের সাথে সাথে পড়ে শেষ করা যায়। হ্যাঁ, আমি পড়ছিলাম আস্তিকপুরের এক কবি, লেখক ও ছড়াকার 'মহম্মদুল হক' এর লেখা "মঙ্গলময়" নামক রহস্যময় এক অনু উপন্যাস।
নাম ও লেখক দিয়ে কিছু মনস্ক বরাবর লেখার ধাঁচ ও কল্পিত তির্যক ব্যঙ্গাত্মক প্লট খুঁজে সরিয়ে রাখে সে সব লেখা ও বইপত্র। এটা চরম হতাশার সাহিত্যের মুক্ত মঞ্চটায়।
নাহ, এমন কিছু হয়নি বলেই নিজেকে ঢুবিয়ে দিয়েছিলামঃ তাঁর লেখা মঙ্গল গ্রহকে নিয়ে এক সায়েন্স ফিকসান।
গল্পের নেতৃত্ব কলকাতার বিজ্ঞানি ধনচাঁদবাবু যেনো এক "ভেতো বাঙালি - অকর্মার ঢেঁকি" শব্দ গুলিকে নিমেশে ফুৎকার দিয়ে লালমাটি মঙ্গল গ্রহে তাঁর স্বপ্নের মহাকাশযান "জিনিয়া" নিক্ষিপনে অপেক্ষামান। বহুবিধ বাঁধা অন্তর্ঘাত অতিক্রম করার পর। একের পর এক
খুন, চক্রান্ত, প্রেম, বিহ্বল ও রহস্য জ্বলজ্বলে ছবিতে উজ্বল।
নিখুঁত দৃশ্যপট সব। ছায়াছবির মতো চোখের সামনে স্পষ্ট হবে চরিত্রগুলো পঠনকাল-সময়।
তাঁর অনু-উপন্যাসের চরিত্র গুলো হাতিবাগান, তোপসিয়া, পূর্ব বর্ধমানের আস্তিক পুর কিম্বা সোনাগাছির পল্লির ভীষণ নিজস্ব।
গল্পেঃ " ধনচাঁদবাবু জীবনে এই প্রথম আবেগমথিত কন্ঠে বললেন, লালগ্রহে কেউ কোনদিন যদি তোমার পদবী জানতে চায় তাহলে তুমি নিঃসংকোচে নামের শেষে আমার চাঁদটা যোগ করে বোলো!"
উক্তিটি ছিলো গল্পের বীর নায়িকা, সোনাগাছি পল্লি থেকে তুলে আনা' কঙ্কনা' (কণা) - র উদ্দেশ্যে।
লালমাটিতে পৌছবার পর একের পর এক রহস্য, কঙ্কাল-মৃত্যু, বিভীষিকা। আর মাঝখানে ফুটে ওঠা জীবন সংগ্রাম আর প্রেম সংসার নতুন মাত্রা এনে দেয়।
চরম শিহরণ বিদ্যমান, " কণাই এখন তো তার মস্ত বড় এক বই। ওকে পড়লেই এগ্রহে রচিত হবে মস্ত এক মহাকাব্য"।
কিম্বা, " কি সুন্দরীই না দেখাচ্ছে তাকে। চুলগুলো বেড়ে যুবতী বুকের উপর দিয়ে হাঁটু ছুঁই ছুঁই। ওগুলিই তার লজ্জা ঢাকার আবরণ"।
" কণা ওর দু'হাতের আঙুলের ফাঁকে আঙুল গলিয়ে চাপ দেয়। আদ ঠিক থাকতে পারে না এ স্পর্শের আবেদনে। এখন গাছের নীচে সে তার কামনার সঙ্গীনিকে নিয়ে সৃষ্টির উদ্দামতায় মগ্ন"।
আদমান ( আদ) গল্পের নায়ক।
বিশেষ উপলব্ধিতে,
" এখনো এগ্রহে আগুন জ্বালার ব্যবস্থা নেই। তাই লোভ ভোগের ধোঁয়াও নেই। জীবনে তাই ধোঁয়াশার মানসিকতাও নেই"।
" বাঁচার জন্যে সংগ্রাম আছে ঠিকই তবু একান্ত নিজস্ব এ জীবন ধ্বংসের জন্যে ভুলেও ভাবেনা। শুধু কাজ করে সৃষ্টির জন্যে"।
গল্পে, " গাছগুলো মানুষের যত্ন পেয়ে বাচ্ছা ছেলের মত দামাল হয়ে উঠেছে"।
আর কণা আর আদ, " পাসাপাশি বসে ওরা কত কথা- কত স্বপ্ন গড়ে চলে তার পর...... "।
মঙ্গলে জলকেলির পর, " কণাও আদের দিকে বিহ্বল ভাবে চেয়ে আছে। দেখার ভুল হয় নি তো তার? সে তো আদই ! কি অসম্ভব সৃষ্টি এক পুরুষ ! ওরা এভাবেই দাঁড়িয়েই থাকে । চুল থেকে জল চুঁইয়ে শুকিয়ে চুল রেশমের মত হয়ে গেছে তবু পরস্পরকে দেখা যেন শেষ হয় না। মুহুর্তে মুহুর্তে ওদের সৌন্দর্য্যতা যেনো বেড়ে যাচ্ছে। আদ কণার কাছাকাছি হয়। কণা মাটির দিকে দৃষ্টি নামায়"।
এখন নিখুঁত বর্ননা পুরোটাতে।
চোখ বন্ধ করে পাশাপাশি শুয়ে চিত হওয়া কণাকে, " আদ বলে, কত তারা ফুটেছে দেখো কণা !
ইস্! সত্যি তারা তো! কণা উঠে বসে "।
" চুপি চুপি কানে কানে বলেছিলো, তুমি কিন্তু চিরকাল আমার কাছে এই আদিম পুরুষটি হয়েই থেকো আদ" !
হলপ করে বলতে পারি সহজ সরল ভাবে আবেগময়তা পুরো অনু উপন্যাস টিতে আপনাকে কল্পনায় এক অন্য জগতে পৌছে দেবে।
 
 
★ গ্রন্থ দৃষ্টিপাতে : বিষফল ( 22.09.21), 04. 34 P.M.

  • Digg
  • Del.icio.us
  • StumbleUpon
  • Reddit
  • RSS