- গ্রন্থ মূল্যায়ন -
জীবন যন্ত্রণায় বিদ্ধ হলে কলমও যে কত তীব্র হাহাকারে ফেটে পড়ে তার উৎকৃষ্ট সনদ : কবি হুমায়ুন রসিদের কাব্য গ্রন্থ "অথবা মৃত্যুচুম্বন"।
এটি কোন নিছক বই নয়, একটা গোটা জীবনের নির্জাসিত যন্ত্রনা, প্রতিবাদ, স্পর্ধায় ঠাসা এক তাজা অমূল্য সমাহার ।
পাতা ওল্টালাম.... স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। সূচিপত্রের আগের পাতা খানি একরাশ কথা ঘোষনা দেয়: " যাঁরা আমায় অক্ষর চিনিয়েছেন - সাজিদুল হক ও আসমা বিবি "। সূচনা অনেক কিছু জানান দেয়।
কবিবর লকডাউনে যে আর্তনাদে ফেটে পড়েন - " রাষ্ট্রের যাঁতাকলে আমরা/ থেঁৎলে যাচ্ছি হঠাৎ-ই মৃত্যু ভালোবেসে মরে যাচ্ছি"।
পরক্ষণেই তর্জনি তুলে সূচিত করে- " একটি কালো সময়ের ভিতর/ গড়িয়ে যাচ্ছে সভ্যতার দিকভ্রান্ত চাকা"। কিম্বা " প্রতিটি ঘূর্ণন রেখে যাচ্ছে / নীল যন্ত্রণার ব্যর্থ পদচ্ছাপ"। আর " রাত্রির জঠরে ঘুমিয়ে আছে শতছিন্ন নদী"।
তারপরেও মাথা তুলে কম্পিত গলায়: " জিঘাংসার অগ্নিস্রোত চিরে চিরে/ আমরা একদিন নিয়ে আসতে পারবো/ রক্তিম নক্ষত্রের আলোর ছাঁট"?
ফেরার ডাকে কবি অবিচল : " কাকভেজা রাত পেঁচার মতো ফেরো/ এখন ফেরো যেকোন সময়/ গোপনে সংগোপনে অথবা প্রকাশ্যে / যেভাবে হোক ফেরো/ শুধু ফেরো শুধু ভালোবাসো একবার/ বন্ধহোক বুকের রক্তক্ষরণ "। তৃষিত হৃদয়ে বিশুদ্ধ ভালোবাসার বর্ষনই কাম্য। সে আহ্বানে নারী না প্রকৃতি কিম্বা ঝঞ্ঝাহীন বিশ্ব তা ছাপিয়ে যায়।
চোখ চলে যায় বাতানুকূল ঘরের বারান্দায়। উচ্চারিত হয়: "হিংস্র সারমেয় নির্মানে অক্ষম/বালি-সিমেন্টে মেশাতে পারে না রক্ত-ঘাম"। আর ওদিকে " সামান্য বৃষ্টিতে বারে বারে ভিজে যায় বাবুই-যের বাসা" । কিভাবে? তাও কবি ছবি দিলেন : " দগ্ধ জঠরের বিবর্ণ যন্ত্রণার দীর্ঘশ্বাসে"।
এ এক অন্য রকম বেঁচে থাকার ইতিবৃত্ত বটে। বলে ওঠেন : " স্বপ্নে চোখ মেলে দ্যাখো একবার/ বুকের জমিনে প্রস্ফুটিত স্বপ্ন"।
তাই তো তিনি বলতে পারেন একমাত্র, " হে প্রিয়তমা / বুকের রক্তপিয়ালি বয়ে যায় যাক/শুধু একবার স্বপ্নে দ্যাখো নিতান্ত ভুলবশত"। কিম্বা " শুধু একবার স্বপ্নে দ্যাখো নিতান্ত ভুলবশত / সিগারেটের ধোঁয়ায় বুকের পোড়া রক্ত"।
পরক্ষনে আর্তনাদ ছাপিয়ে ককিয়ে ওঠেন: " বাঁচতে চাও বাঁচো/ অথবা মৃত্যুচুম্বন/ লড়তে চাও লড়ো/ নতুবা দাসত্ব / আর কে না জানে দাসত্ব একটি মৃত্যুচুম্বন"। তিক্ষ্ণ চয়ন। কিম্বা " বাঁচতে চাও বাঁচো/বাঁচো বাঁচো এবং বেঁচে থাকো/ অথবা মৃত্যুচুম্বন"। সত্যি শিহরণময়। তীব্র যন্ত্রণা থেকে যে নিদারুণ চাওয়া উঠে আসে কলমে: "আমার কবরে থুতু ফেলো থুঃ থুঃ করে"। তবেই ঘটবে কবির শান্তিময় ঘুম নিরব। "এখন এইটুকুই তো চাওয়া" কবির কথায়।
কেননা ফ্যাসিবাদী চেয়ার দখলে : "বৃষ্টির গুঁড়োর মতো গুঁড়ো হচ্ছে জীবন/প্রতিরোধহীন পিঁপড়ের মতো/চুরচুর হয় স্বপ্ন/গুঁড়ো স্বপ্ন তরঙ্গের গর্ভে জন্ম হয় স্বপ্ন /এভাবেই এগিয়ে চলে জীবন"।
সেক্ষেত্রে জীবন : আলপথ থেকে আলপথ/ প্লাটফর্ম থেকে প্লাটফর্ম / যেভাবে ক্ষুধার্ত কুকুর/উঠোন থেকে উঠোন/ গ্রাম থেকে গ্রামান্তর / হন্যে হয়ে খোঁজে একমুঠো উচ্ছিষ্ট"।
সত্যিই জর্জরিত, নিশ্চিহ্ন হবে মানবতা ক্রমশ নয়তো।
কবি নিথর নিরালায় বসে ডাক দেন : "আমাকে যদি খোঁজ কোনদিন /মেঘেদের পাহাড়ে সন্ধ্যাতারার দিকে/পাবে না"। কিম্বা "আমাকে যদি খোঁজো কোনদিন / অববাহিকায় ঠিকরে পড়া অরণ্য চন্দ্রিকায়/সুবর্ণরেখা, মাতলার স্রোতে/পাবে না"। আর, " বসন্ত পলাশের নির্যাসে আকন্ঠ/আড় বাঁশি হাতে রকে বসা কিশোর দলে/ পাবে না"।
কারন, "কি করে পাবে বলো/আমি তো রাত্রির ধারলো কিনারায়"।
পরক্ষনে তীব্র রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে গর্জে উঠে সজাগ করেন : " যে কোন সময় লালনের মাটি দখল নেবে/হিংস্র হায়নার দল/তার লকলকে জিহ্বায় গেরুয়া গরল"।
আর সূচিত করেন বিপ্লবী জবাবে, "এ মাটিতে কবর খুঁড়বো হিংস্র হায়নার"। বলো রুখে দাঁড়াবার সত্যি সময় এলো।
" অবেলায় বুকে বুকে জাপ্টে থাকা পার্ক" কেও কড়কে জানান: " সব ফাঁস করে দেবো/আনমনে বসে থাকা ইস্টিশন/ব্যাগ ভর্তি না-দেওয়া চিঠি/বুক ভর্তি স্বপ্ন/গরম শ্বাস-প্রশ্বাস"।
অথচ যখন : "শ্রেনি বৈষম্য ছুঁয়ে ফেলে আকাশ", তখন " তুমি আমি বসে আছি বাল-গোধূলির পাড় ঘেঁসে/এমন সময় ভোজ্য তেলের দাম বাড়ে"। কি নিদারুণ শব্দাঙ্কন সব।
আর " ভোটে জিতে সে কী উল্লাস/ যেনো শুয়োরের গর্জন"।
হাহাকার যার গতিময়তা সে তো উচ্ছারনে জানান দেয়, " যে প্রেমে পুড়েছে হৃদয়/সে প্রেম কেনো আসে বার বার?/আমি তো চাইনি"। চরম বাস্তব সত্য বরাবর। প্রেম কষ্টের বাহন হয়েও অমৃতের দাবীদার।
তাই কবি বলে ওঠেন, " আরো একটি মৃত স্বপ্নের ভেতর/ স্বপ্ন-পোড়া আগুন ছুটে যায় প্রজন্মান্তর "। ঠিক এভাবেই ভাগচাষীর কান্না ব্যক্ত হয়।
প্রেয়সীর আত্মসমর্পণ এর ডাকে সূচিত হয়, " বলো সংসার-সংসার খেলায়/রক্তবমি উঠেছে তোমার গলা অবধি/ বলো ভুল খেলায় ছিন্নভিন্ন জীবন"।
চিরন্তন বন্দি প্রেমহীন সংসারের চিত্র এ এক ভীষণ ।
তাই কবি যেটা করেন, " সোনাগাছির গলি পথে হাঁটি/ একা একা হেঁটে যাচ্ছি কবরবাড়ি"। কিম্বা, " আমার পথের চৌদিকে ফুটে উঠছে প্রাক্তন ছায়া/বুকের ভেতর আছাড় খাচ্ছে মায়া"। আর, " মাতাল ঝড়ের অন্তরীক্ষে হেঁটে যাচ্ছি /চোখের রক্তে নিচ্ছি ইস্পাত শপথ"।
আর একে একে চোখে পড়ে, "ধ্বসে পড়া বালুস্তুপের মতো/ ক্ষয়ে যাচ্ছে সভ্যতার পাঁজর/মানুষ আর মানুষের মাঝে দীর্ঘতর হচ্ছে প্রাচীর"। আর সেসময়, " কুড়ি টাকায় ভাড়া খাটে সুস্থ যোনি আর/রাষ্ট্র ঘোষণা দেয় গরুর মূল্য "। কিম্বা তখন, " ধর্ম গৃহের দেওয়ালে সাঁটা হয় মোজাইক পাথর"।
নিখুঁত চোখে এড়িয়ে যায় না একচুলও বাস্তব গোপন চিত্রও কোনো। স্যালুট তাই সময়োপযোগী কাব্যে বিশ্লেষণ "অথবা মৃত্যুচুম্বন"।
" হাঁটতে হাঁটতে সন্ধে নামে পাড়ায় পাড়ায়/ হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়ে / সংসার-সংসার খেলায়"। বছর দশেকের একটা পেপসিঅলা।
চরম বেদনায়, " ঘুম ভাঙা মধ্যরাতে/এখনো আঁকো নেমে আসা বিকেল?" কিম্বা " বিলাপে বিলাপে পার হয় বুঝি জন্ম-জন্মান্তর"।
দ্রোহের কলমে যখন শানিত হয়, " কোন আগুনে পোড়ে না/রফিক সালাম বরকত জব্বারের রক্তমাখা জামা/পৃথিবীর কোন পুঁজিপতি কোন বেনিয়ার ক্ষমতা নেই/ একটি রক্তমাখা জামা কিনবার"। আর, "মৃত সূর্যের ভিতরেও পত্ পত্ উড়বে/ অ-আ-ক-খ খচিত একটি রক্তমাখা জামা"।
সত্যি এ লাইন গুলো সময়ের কাছে অমরত্বের দাবিদার।
কিম্বা চরম হতাশায়, "ভালোবাসায় বাঁধবো কাকে?/কোন হাতে রাখবো হাত?/সবাই হাত ছেড়ে দিচ্ছে "।
তাই উচ্চারিত হয়, " আমার কবিতা শ্মশানের ছাই ভস্ম খায়/আমার কবিতা বিদ্রোহে ক্ষিপ্রতায়/ছুড়ে দেয় মুষ্টিবদ্ধ হাত"।
কিম্বা, "আমার কবিতা ডাহুকের সুরতিথি লিখে রাখে/ইতিহাসের পাতায় পাতায়"।
পুরো কাব্যজুড়ে পরতে পরতে অসামান্য শব্দের বিন্যাস, চিত্রকলা এক এক । সৃষ্টি আর সৃষ্টিতে সমৃদ্ধ হয়েছে।
জেলেজীবন এর চিত্রে, " সাপের ফণার মতো ঢেউ ভেঙে ভেঙে/খুঁটে আনে পেট-খোরাক"। কেমনা, " এখানে জীবন/ প্রজন্মান্তর জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায়"।
কবির ক্লান্ত শরীর যখন বিছানায়, " চোখে চোখ রাখলে/ কিঞ্চিত স্পর্শ দিলে/ মুহুর্তেই তোমার চোখ কোকনদ,অর্ধনিমীলিত "।
তাই কবি উচ্চারণ করে, " গ্যারান্টি দিতে পারি আমার ওষুধ সেবনে/নিশ্চিত রোধ হবে তোমার ভাঙন"।
স্রষ্টা তো এমনই হয়, " আমি পথিক অথচ/ আমার কোন পথ নেই"।
অথচ কেবল ভাতের জন্য, " যা ইচ্ছা তাই করতে পারি/সীমান্তে কাঁটা তারে লাগাতে পারি আগুন"। কিম্বা, " আমার পেটে ক্ষিদে থাকলে/খেয়ে ফেলতে পারি/মন্দির - মসজিদ-গীর্জার মোজাইক পাথর"। " স্রেফ একমুঠো নুন-ভাতের জন্য /করতে পারি বিশ্বব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ "।
কেননা, " ক্ষুধার্ত মানুষের কেউ নেই/তুমি নেই রাষ্ট্র নেই কেউ নেই"।
সেখান থেকে ডাক দেন, "তীব্র অভিমানে বসে আছো বিষন্ন রাত্রির মতো একা/অঝোরে বৃষ্টি দুচোখে তোমার/তবু তুমি ফিরে আসবে না?"
কিম্বা "সব পাখি জানে গাঢ় গোধূলি তলিয়ে যায়/অথৈ তমিস্রায়/তুমি জানো না?"
তাই, " গোলাপের নাভিতে রাখি ঠোঁট/সাধ মেটেনা তাও"। আর, "বুকের অন্তরীক্ষে আষ্টেপৃষ্টে জাপ্টে ধরি নগ্ন মূর্তি /স্তনবৃন্তে রাখি তৃষ্ণার্ত ঠোঁট/সাধ মেটেনা তাও"।
তাই, " নির্জন টিলার পরে বসে/নিজেরই ছায়াকে দিই পূজো"।
আর ঘোষণা দেন, " হে জীবন/নিয়মতান্ত্রিক শিকল খুলে দিলাম"। আর বসন্তের আবাহনে, " রোদ-পোড়া কৃষকের নোনতা ঘামের/দুঃখ নিতে দাও"।
তোমার স্তনবৃন্ত ও নাভীর গভীরে ওষ্ঠচ্ছাপ/অক্ষরে অক্ষরে কবিতায় এঁকে/ আমি নিঃস্ব ও নষ্ট হতে চাই"। কেননা, " আমি তো নষ্ট হতে চেয়েছি বার বার"।
বিষাদ যন্ত্রণা গাঁথার পরতে পরতে অসামান্য সৃষ্টির গাঁথুনি আমি তো দেখলাম। মুগ্ধ হলেম চরম এক স্রষ্টার লেখমালায়। সত্যি, সাহিত্যসৃষ্টি আর বন্দি থাকবে না এলিট মিডিয়া ভিত্তিক।









0 comments:
Post a Comment