পাঠশালা
নয়
দুর্গতিনাশি
বিড়ির টকটকে আগুনে বাংলাদেশটা জ্বলছে,
আফগানিস্থানটা জ্বলছে
সমস্ত দেশ জ্বলছে।।
অতীতে যেভাবে খান্ডবটা জ্বলেছে
জতু গৃহটা জ্বলেছে।
আকাশের দিকে চোখ বুজে,
মুঠোতে ধোঁয়া টেনে নিন বুক ভরে
তাকিয়ে দেখুন আগুনে
বিড়ির টকটকে আগুনে বাংলাদেশটা জ্বলছে।
শৈশবে একবার লুকিয়ে দূর্গা প্রতিমাকে প্রনাম করেছিলাম,
বন্ধুর চোখ এড়ায় নি সেটাতে।
বলেছিলাম 'তোর মা ও আমার মা হয় রে'
বন্ধু আর কথা বলেনি সে উত্তরে।
আজ যদিও অনেক বিচার এসেছে,
বহু ভ্রমকে আমার আত্মীয় বানাতে অসুবিধা আছে।
চড়চড় করে পুড়ছে ঐশ্বরিক অহংকার
বেলপাতার মতো পুড়ছে
সদ্য ঘি মাখানো লাশের মতো পুড়ছে
চড়চড় ফটফট
যেমন পোড়ে কাঁচাকাঠ।
সেভাবে পুড়ছে গোটা পৃথিবীটা
যেভাবে ক্ষুধায় পোড়ে নাড়ি সব।
নয়নের মোমদানি যেভাবে গলে জল,
টসটস বেয়ে পড়ে চিবুকের সৈকতটায়,
সেভাবেই পুড়ছে মানুষ গোটা।
শিক্ষাগুলো বেচারা লাইব্রেরীতে বন্দি,
আসামীর তালিকায়।
হৃদয় গুলো বাঁটোয়ারা হয় পার্কের বেঞ্চিতে সার সার,
বেশিরভাগ দূরত্বের সম্পর্কের আয়ু টেনেটুনে ছ মাস
তারপর পড়ে থাকে মেশিন থেকে নিগড়ানো আখের ছিবড়া যেমন হয়।
কথার ফুলঝুরি চরকি ধর্মগ্রন্থ ময়,
প্রেমিক প্রেমিকার বুলিতে আজ।
ঝড় গুলো সব হৃদয়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে,
আমার একটাও আত্মীয় মৃত্যু আর নয়।
গোটা বিশ্বটা আমার আত্মীয়তা চেয়েছে...
অপরাধী গুলোকে লাইব্রেরীর চার দেওয়ালে পুরে দিয়েছি,
আমি কথা দিয়েছি
শান্ত করবো পৃথিবী।
★ লেখা : দুর্গতিনাশি
★ কলমে : বিষফল (19.10.21), 11.56 P.M.
কা কা...
প্রগলভতা
কাপালিক বাস
আচ্ছন্ন
নির্জন শ্মশান...
বুকের কলসিটা আছাড় মেরে ভেঙে ফেলি যেনো আজ ।।
বুকের মধ্যে দাউদাউ নেভাই ক্রমশ কাঠকয়লায়।
রেললাইনে বসে গুনি সার সার সহস্র বুকের দির্ঘ শ্বাস...
ট্রেনগুলো শহর ছুঁয়ে ফিরলে আলাদা একটা সুবাস নিয়ে ফেরে বোধহয় !
পেয়েছেন কখনও তা?
সন্ধায়? কিম্বা রাত? বারোটা একটা?
একবার শহর ফেরা ট্রেনের ঘ্রাণ নিন বুকটায়।
একবার প্রেম গুলোকে ঝাঁকান বুকটায়....
রেলের ওপর বসে নিজেকে ঈশ্বর ঠাওরান।
হাত, পা, হৃদয় ছুঁড়তে থাকুন নক্ষত্র মালায়।
তখন আপনি অমৃতের স্বাদের থেকে; আর বঞ্চিত থাকবেন না !
শবপোড়া ভুক পিঁপড়েদের স্বেচ্ছায় কামড় খেয়েছেন ?
অথচ পাকস্থলীময় অ্যালকোহল
কিম্বা দু আঙুলে শক্তকরে ধরা কারো জ্বলন্ত চোখ....
বুকের কলসিটা আছাড় মেরে,
পোড়া কাঠগুলোর পাসে শুইয়ে রেখে আসি রোজ।
★ লেখা : আচ্ছন্ন
★ কলমে : বিষফল ( 13.10.21), 10.15 A.M.
প্রাজ্ঞ
নোনতা জল ঠোঁটে ঠ্যাকালে।
এত দুঃখ কোথা পাও হে নদী জানাবে?
চিকেন পকোড়া বিষ্ঠা লাগে,
লাল সবুজ সসে।
বলতে পারো চাউমিনের ডিমে কত শুক্র গোঁজা থাকে?
শশা কুচি ঠোঁটে দিলে,
আজন্মের খিদে উগরে আসে।
নদীর চরে এত বালি কোথা হোতে আসে?
উকুনের পেটের রক্তে...
বহুকাল উষাকাল লেখা হয়নি যে।
চিত হয়ে তুমি এখনও ব্লাকহোল গুনবে?
প্রহরগুলো শেষ হচ্ছে মেরু বরফ গলে,
ইগলু আমার নিঝুম আবাস, চুপ চুপ করে?
★ কলমে : বিষফল (28.09.21), 10.47 P.M.
অপরাধ
প্রকাশ্যে হত্যা আমরা আর উপহার দেবো না,
ত্রিশূল নামান.....
হিংস্র পশু লেলিয়ে কলোসিয়াম আর নয়,
মশাই আপনার চক্র নামান।।
লেচি ভ্যাঁটা নিন, ঘোরান....
ওভাবেই কি পৃথিবী ঘোরে বনবন?
বেআইনি অস্ত্র রাখার, হত্যার পারমিট পেলেন কোথায়?
কি বললেন? তালিবান?
ফাটকমে ঘুসাদো হারামজাদোকো....
জয় মা...
পাস দিয়ে বের হয়ে গেলো একটা সাঁইসাঁই রামদা,
নমস্তে ঈশ্বর।
এই নিন চাঁদটা গুঁজেনিন আপনার খোঁপায়।
আহ কি ধুনো গন্ধ চতুর্ময়
নিন রক্ত ঝরান....
আমার গায়ের রং,
মনের রং,
টুকটুকে কালো সব...
বিকট ৷।
আপনার প্রকাশ্যে হত্যা করা বাহুটা ধরে শহিদ হবো আজ....
সামনে সারসার আমার সন্তান।
ওদের প্রত্যেকের হাতে বেলুন এক একটা৷
কি ভীষণ নির্লজ্জ আর বেমানান এসময়,
ত্রিশূল, বন্দুকের নল নামান।
পড়ে আছে গোটা জান্নাত জাহান্নাম..
আপনি বিচারক?
আজান দাও, শাঁখ বাজাও....
প্রকাশ্যে নরহত্যা হবে আরেকটা ।।
কাফের কিম্বা রাক্ষস গুটিকয়।।
আহ, কি সুবাস কলোসিয়াম ময়।
বেলুন ওড়ান, বেলুন ফাটান,
এই নিন বন্দুকের নল...
★ লেখা : অপরাধ
★ কলমে : বিষফল (11.10.21), 07.47 P.M
কাম
তোমার মনের ত্বকে স্পর্শ করলাম.....
তুমি শিহরণে ছটফট।।
তোমার বন্ধ চোখের বাকল খুললাম....
হৃদয়টা কি ভীষণ নগ্ন জোছনায়।।
কালরাত থেকে নাকে আসছে প্রনয়সুবাস।
কলকল করে পাথরে নামছে জল....
ভেসে চলে প্রবাহে একান্ন খন্ড সতীর শব।।
আমার ফুসফুসে জমাট বাঁধে কালবৈশাখী ঘ্রাণ,
কাঁকর বালিই আমি থপ করে বসে পড়লাম।
কাঁকরোল গাছের ডালে সন্তানকামী চুড়ুইয়ের কি তীব্র চিৎকার
তোমার মনের ত্বকে স্পর্শ করলাম....
আঁৎকে উঠলাম,
চুল্লীর জঠরে এত কাম?
মেঘগুলো নেমে আসে পালের চোখটায়....
তরতর করে মন বেয়ে চলে যায়।
আমি আমার শরীরটা একান্ন খন্ড করে ফেললাম।।
★ লেখা : কাম
★ কলমে : বিষফল ( 09.10.21), 03.27 P.M.
ছিপ কড় বড়শি
★★★ ছিপ কড় বড়শি ★★★
ছিপে মাছ ধরে সে মাছ খাওয়াটার স্বাদকে বোধহয় অমৃত বলে। নয়তো অমৃতের স্বাদ মিথ্যা। যদি সেটা নিছক সোমরস জাতীয় কিছু হয়।
সবার শৈশবে কম বেশি মাছ ধরার চিরকুট অভিজ্ঞতা থাকবে না, তা হয় না।
ছিপ
কঞ্চি হোক বা বেত। কেঁচো, ছোট ব্যাঙের বাচ্চা কিম্বা ঝিঁঝি পোকা গেঁথে মাছ
তোলার তৃপ্তি সত্যি আলাদা। নিদেনপক্ষে রুটি করা আটা গুলে বড়শিতে লাগিয়ে
পুকুরে বাদাতে ফেলেছি ঢেড়। শৈশবটা মাঠের সাথে সখ্যতায় গড়ে উঠেছে। কই শোল
ল্যাটা জাপানি পুঁটি রুই মৃগেল কাতলা কখনও সখনো শিং মাগুর ফলি প্রভৃতি সব।
এখনতো
মনপিয়া বেশি ওঠে। শৈশবে মনপিয়া রুপচাঁদ পুকুরে চাষই হতো না, নতুনই মাছ
এসব। পুকুর ডুবে মাছগুলো সারা বাদায় ছড়িয়ে যায়। খালে মাছ ধরার অভিজ্ঞতা
আমার কোনকালে ছিলো না। একটা সময় খালের পরিষ্কার জলে প্রচুর বোগো মাছ চরতে
দেখতাম, খেতেও আমার দারুন লাগতো মাছটা। প্রত্যেকটা মাছের আলাদা একটা গন্ধ
থাকতো।সেটা না এলে আহ... খেয়ে মজা হতো না। বাবা হাট থেকে নিয়ে আসতো তা। আগে
গ্রামের হাটটায় কত রকম মাছ আসতো সব। তখন সেসময় কত মাছের পসরা। কত লোক হতো
হাটটায়। সপ্তাহের দুটো দিন বিকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত যেনো মেলা বসতো। কত
লোক কত আনন্দ। কত রকমের খাবার দাবারও আসতো। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম। বাবা
বাইরের খাবার খেতে দিত না। যারা কিনে খেতো সেসব, মনে হতো কত সুখি তারা।
বাবা নিয়ম করে ওই হাটে আসা নাপিতদের কাছে পাতা ইটটায় বসিয়ে দিয়ে বলতো
কদমছাঁট করে দেবে, যেনো মুঠো মেরেও ধরা যায় না। আমার খুব খারাপ লাগতো সে
সময়। যারা একটু বড় বড় চুল রাখতো, আমার খুব ভালো লাগতো তাদের চুলগুলো। হাটের
এক ধারে উঁচু মতো পুকুরের পাড়ে তিন চারজন বুড়ো বুড়ো নাপিত বসতো হাটবার
গুলোতে। আজ আর সে সব বসে না। চটকদার সব সেলুনে ছেয়ে গেছে। কত বড়বড় আয়না,
কত দামি দামি চেয়ারে বসিয়ে আজ চুল কাটে সব। কোথাও
একটা স্বাদ মিস করি
সেসব আজ না থাকায়। হয়তো সেদিন গুলোতে প্রাচুর্য ছিলো না,বড় করে চুল রাখার
পারমিশন থাকতো না। তবুও সপ্তাহের দুটো দিন আমার কাছে মেলাই মনে হোত।
চুলকাটা হয়ে গেলে ঘাড়ে পাউডার ঠুকে বলতো হয়েগেছে উঠে পড়ো খোকা। উঠে পড়তাম।
আবার মুখ লুকোবার জন্য তৈরি হতাম। বাবার হাত ধরে বাড়ি ফিরতাম।
মাঠের
মাঝখানে আমাদের একটা ঘর ছিলো সেসময় । চারিদিকে জলমগ্ন থাকতো প্রায় । আর
ধান কাটা হয়ে গেলে মনে হতো চারদিকের পুরো বাদাটা আমার। নয়তো একা একা কাটতো
সময়গুলো সব। ধান কাটার পর মাঠ শুকাতো, গ্রাম থেকে ছেলেরা আসতো পিচ করতো কেউ
বা ফুটবল। বাবাও আমায় একটা ফুটবল কিনে দিয়েছিলো। ব্যাটবল খেলতে দিতো না।
তখন সেজন্যও রাগ হতো খুব আমার। ওরা অতজন খেলে ওদের লাগবে না বল সাঁইসাঁই?
আমায় নিয়ে ওরা বড্ড বেশি চিন্তায় থাকতো। বুঝতাম। তবুও রাগ হতো আমার। চুপচাপ
কাটতো একা একা বসে জলের দিকে তাকিয়ে কেবল। লতাপাতা, গাছ, ধানের গাছ এসবই
আমার একান্ত ঘোর শৈশব। আমগাছে তেঁতুল গাছে কত না পাখির বাসা হতো। উঠে ডিম
চেক করতাম। বাচ্চা গুলোকে পেড়ে আনতাম। বাবা বকতো। মা ও। মন খারাপ হতো।
আবারও গিয়ে রেখে আসতাম।
গ্রামের কত ছেলে ময়না পাখি বাঁসা থেকে পেড়ে নিয়ে কি সুন্দর পুষতো সব। আমার সে সুযোগও কেউ দিত না।
এখন যা ইচ্ছে হয় তাই করি, কারো বাধা শুনিনা। তবে পারিনা এখন সেই ঘুঁড়ি ওড়াতে, পাখির বাচ্চা পুষতে। এসময়ে হয় না কেনো এমন সব সখ?
এখন মনে মনে ওড়াই কত রঙিন কতরকম ঘুড়ি সব। ঘুমের মধ্যে লাটাই সুতো নিয়ে খেলি, কেউ কিচ্ছু বলে না।
শিশুদের শৈশব চুরির একটা মামলা করবো সময়ই হলো না তার।
গত রবিবার ডাক এলো, এটা আর স্বপ্নে নয়।
খালে মাছ ধরতে যাবি? কত রকম বড় বড় মাছ উঠছে সব।
বললাম চল।
দুজনে গেলাম স্টেশন থেকে চার বড়শি চোঁয়া পিঁপড়ের টিপ কিনলো রজত।
রজত। ও ব্যাটার আদ্যিকালের সখ।
কোথায় যাবি আজ?
খালে ছিপ ফেলতে যাবো আজ।
সবাই কত বড় বড় মাছ ধরে নিয়ে আসছে জানিস।
ও সবার মুখে শুনে স্থির থাকতে না পেরে বললো চল।
ওর বাড়িতে খেয়ে, দুটো ছিপ নিয়ে স্কুটিতে চেপে বসলাম।
জিজ্ঞেস
করে করে দূরের একটা খালের কাছে ব্রিজের পাসে গাড়ি থামালো ও একটা সময়।
গ্রাম ছেড়ে অনেকটা দূর। কি ঘন নির্জনতা সেথায়। জলের কাছে পৌছালে বুকের
মধ্যে তোলপাড় করে মাছের সব ঘ্রান।
আহ জোর বাতাস নিলাম বুকটায়।
খালের পাসদিয়ে রাস্তা। জলে ডুবে হাঁটুজল।
বললো প্যান্ট গুটা, ও ও গুটালো হাঁটু অব্দি। জুতো খুলে হাতে সবার। আর এক হাতে কাঁধে ফেলা ছিপটা। আর একহাতে ব্যাগে চার মাছের খাবার।
টোপটা বানানোটা কম ঝক্কির নয় দেখলাম মনদিয়ে সব।
মিষ্টি
দোকান থেকে কেনা স্লাইস রুটিটা একটা মগে কুচিকুচি করতে বললো ও। দুজনে
করলাম। যেমন দেখালো করলাম। তারপর ও ঢেলে দিলো পিঁপড়ের টিপ। মাখালো।
শোঁকালো কি দারুন একটা সুবাস। তারপর একটু চার দিলো মিক্সিং প্যাক দোকান
থেকে কেনা। তারপর তাতে ঘি দিয়ে চটকে চটকে আহা কি খাসা মাছের টোপ এবার ।
ও বললো বহুজন খালে মাছ ধরতে আসবে, যার টোপটা তাদের পছন্দ হবে তার ছিপে উঠবে মাছ। মাছ ধরা অতো সহজ হয়।
মাছ আর বিলাসীনি নারী ভীষণ এক?
হাঁটুজল
টপকে ডাঁঙায় উঠলাম। সোজা খালপাড়। বহুদিন পর এত গাড় নির্জনতায়। চারদিকে
শুনশান। মাঠ আর মাঠ। ঘর বাড়ি ছাড়িয়ে শূন্যতায়। জলের ঢেউ ছুঁয়ে আসা বাতাস
আপনারা নিয়েছেন কখনও ফুসফুসটায়? তাহলে বুঝবেন না কি ঘ্রাণ সে বাতাসটায়, কি
স্বাদ।
হেঁটে চললাম। হেঁটে চললাম আরো নির্জনতায়।
এভাবে কখনও ছিপ বয়েছেন মশাই?
জলের স্রোত বড্ড সবজায়গায়। একটা গুঁড়ির কাছে এসে বসলাম। ছড়ালো ও চার।
মহাকাশ নিরবতায় দুজনে আমরা। ফিসফিস করে কথা বলবি ওর নির্দেশ ওটা।
ফাতনা নড়ে উঠলো আমার। জলের টান স্হির রাখা কি কঠিন যে হাড়ে হাড়ে টের পেলাম।
মিস
করলাম। একটা বড়ো মাছ টোপ ধরে চুপচাপ ছিলো। এমনি তুলতে গিয়ে টের পেলাম বড়
একটা মাছ খসে গেলো। আহ আফসোস। কাঁচা হাত কিনা। রজত তো পাকা শিকারী, ওর
হাতে হলে তুলে ফেলতো । প্রকান্ড।
আবার দিলাম একটা হ্যাঁচকা টান।
শালা কইমাছ। প্রথম বউনিটা আমি করলাম। ওর চোঁয়া আশাজনক নয়। শক্ত কমরেডের
মতো বার্তা, কখন মাছ লাগবে বলা যায় না। দেকি একটা বিড়ি জ্বাল।
নাহ অনেকক্ষণ কোন বড় মাছের লক্ষ্মণ আমি ধরতে পারলাম না।
ধুর, ভাল্লাগে না। একটা কই আর এক রত্তি একটা পুটি মাছ।
ওর ছিপ তখনও উপোস।
অনেকক্ষণ পর বললো চল উঠি, এখানে আজ আর মাছ লাগার সম্ভাবনা দেখছি না। আরো ভিতরের দিকটায় চল। উঠলাম।
দু
পাসে আগাছায় ঘন জঙ্গল। তার মাঝখান দিয়ে মাটির রাস্তা। মাঝেমধ্যে ইটের নজর
পড়ছে। বহুকাল আগে রাস্তা ছিলো বোধহয়। এখন নিশ্চিহ্ন সব। হাঁটতে হাঁটতে
একটা লোহার বাঁধ এর কাছে পৌছলাম। আমাদের মতো অনেকেই বসে জলের দিকে তাকিয়ে
ঠায় নিরব।
কেউ চোখে জল এনে নদী বানায়, কেউ চোখটা জলে ডুবিয়ে রাখে সারাবেলা।
ও বললো ওরা সব বড়ো বড়ো মৎস শিকারী এক একটা। বিভিন্ন কায়দায় মাছ ধরতে ওস্তাদ।
ওখানে
একা একটা বোগো মাছকে ঘোরাঘুরি করতে কতদিন পর দেখলাম। আহ কলজেটা এখানেও
জুড়ায়। ওরা নাকি ছিপে সহজে ওঠে না। কি জানি, অতসব জানা নেই আমার।
না ধরছে দেখে ছিপটা দিয়ে জোর মারলাম। ও আর উঠলোই না। মরে গেলো নাকি বেচারা?
কেঁচো
তোলা হলো। পুঁটি মাছ টোপ খেয়ে পালাচ্ছে সব। এটাই শেষ অস্ত্র। নাহ বড়ো
মাছের সন্ধান পেলাম না। আবার পুরানো জায়গায় এসে বসলাম। পাসের মাঠে পাতা
জালে একটা গোসাপ ছটকাচ্ছে দেখলাম। বেচারা আটকা পড়ে মরণাপন্ন অবস্থা। এই
গোসাপে আমার ভীষণ শিহরন জন্মায়। গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। এই একটা প্রানীকে
আমি দেখতে পারি না। গা ছমছম করে দেখলে ওটা। ছেলেবেলায় প্রাইমারি স্কুলে
পড়ার সময় পিছনে স্কুলে গিজগিজ ভাসতে দেখতাম। সঙ্গও লেগে কামড়ে ভাসতো সব। গা
রিরি করা তখন থেকে জন্মানো বোধহয়। আমার ভয় করতো।
ছোটবেলায় মা বলতো ও নাকি যাকে একবার কামড়ায় মেঘ না ডাকলে ছাড়ে না। কি জানি ভয় আরো হতো।
আজ
আটকা পড়ে দেখে কেমন মায়া জন্মায়। কতগুলো ছেলে এসে জোটে বাড়ি দিয়ে আঘাত
করতে থাকে, গোসাপটা ছটকায় জালে জড়িয়ে বেচারা। পরিনতি মৃত্যু বুঝলাম। সে মন
হোক বা জাল। নাহ আমরা আর বেশিক্ষন বসলাম না। মন ভার। উঠে হাঁটা শুরু
করলাম। দূরে একটা ডিঙি দেখতে পেলাম। মাছ ধরছে পাতা জাল ঝেড়ে। তার কাছাকাছি
তিনজন জাল ফেলতে ব্যস্ত সব। দাঁড়ালাম। মাছ ধরা দেখাও বড় তৃপ্তি কর। একজন তো
একটা খলসে আর একটা মনপিয়া তুললো। ডিঙির লোকটা একটা পাওস মাছ। রোজ এভাবে
এরা খোরাকি জোগাড় করে জানলাম।
কারো দুটো তিনতে হলে দিন চলে যায়। সে আশা
নিয়ে আসে ওরা। ব্যস্ত পৃথিবীর সমস্ত জটাজাল ভুলে থাকলাম। ফোনটা বেজে ওঠার
অপেক্ষায় ছিলাম। নাহ সারাদিন জগৎ বিচ্ছিন্ন ছিলাম।
ফেরার সময় আবাও পথ গুলিয়ে জিজ্ঞেস করে করে ফিরলাম।
পৃথিবীর
শ্রেষ্ঠ মেডিটেশন মাছ ধরা। এ শিক্ষা টা বাড়ি নিয়ে আসলাম। ওদিন কপালে মাছ
জুটলো না। আর বুক ভরা তৃপ্তিদায়ক মাছ না পাওয়ার আফশোস ও বোধহয়।
★ কলমে : বিষফল ( 04.10.21) 10.14 A.M.
- গ্রন্থ মূল্যায়ন -
- গ্রন্থ মূল্যায়ন -
পাতা উল্টিয়ে লাইন পড়ে পড়ে কবিতার বই কেনা আমার চিরাচরিত অভ্যাস । কলকাতা বইমেলা ২০০৮
।
সেইরকম ভাবে কিনে ফেললাম “দ্রাঘিমা ও প্রত্নবালিকা” । “কৃপা বসু” কবির নাম
। নবীনা কবিরা এত অগ্নিসম্ভবা আরেকবার আঁচ পেলাম । প্রগতিশীল সমাজ
ব্রান্ডেড কর্মশালার গুঁটিকয় কবিতে সাহিত্যকে আবদ্ধ দেখে তৃপ্ত হয়।
চিরাচরিত প্রথা ভাঁঙা আমার অভ্যাস । তৃপ্তি দিল আমায় । প্রশংসা করতেই হয়
শব্দজাল - বিন্যাস ।
নবীনা চোখের দৃষ্টিতে যাদের দুঃক্ষ বেদনা
কবির লেখায় ধরা দেয় যেভাবে, “চিঠির ঘর বুনতে বুনতে ডাকবাক্স দের চোখে ঢুকে
গ্যাছে চোরাবালি । / বহুকাল হল তারা হাসতে ভুলেছে।”
আর সেই সঙ্গে কবি কৃপা বসু জানান দেয় দৃপ্ত ঘোষনায়, “আসলে আমাদের জীবনে একটা নিরামিষ আয়নার বড়ই দরকার” ।
শব্দ চয়ন করতে গিয়ে তিনি জানান দেন, “অফিসের টিফিন ব্রেকে প্রিয় কবিতার
কাছে এসে বসি মিনিট দশেক মতো, / আখরভান্ড ভেঁঙে শব্দ্সাজাই”।
কখনও প্রচন্ড আহ্লাদে , “বাথটবের সাবানজলে যে প্রেমিক পুরুষ শুয়ে থাকে সরস দৃষ্টি নিয়ে, / ফেনায়িত আদর মাখি তার চুপচাপ” ।
আর কবির ভূল হলে যা করেন অকসাৎ, “অবাধ্য চুল ভেবে পুড়িয়ে ফেলি জানালার পর্দা । / বুকের খনিজে বাড়ে নুনের পরিমান” ।
পরকীয়ার ইসারায় কবি কন্ঠে উচ্চারিত হয়, “পালতোলা নৌকার মত / ফুলে ফেঁপে
ওঠা প্রতিশ্রুতির বাকল ঝুপ ঝুপ ভাঙে ঘষা জানালার কাঁচে” । কিম্বা, “কাঁচের
রেকাবিতে তুলে রাখা / ঝাঁঝালো প্রেম যাকে পরকীয়া বলো তুমি, / তার চিবুকে
এঁকে দিই সস্তার চুম্বন” । অনুভূতির জোয়ারে কবি কন্ঠে ধ্বনিত হয়, “এঁটো
হাতে চেপে ধরি বিবিক্ত ঠোঁট , ধারালো দাঁতে কেটে ফেলি চাঁদের / চিকন সুতো” ।
“
আর দু চোখে, “স্পষ্ট দেখি নকশাওয়ালা চাদরের ফাঁকে ওর নাভিমূল
বেয়ে চুইয়ে পড়ে / কবিতার আখর” । কিম্বা , “আর আমি ঘ্রান নিই, মজে যাই ছিঁড়ে
যাওয়া / ঘুঙুরের শোকে” ।
অমর রহে কবির “শিমুলবালা” ধরায় । সত্যি এ
এক রহস্যময়ী নারী, উচ্চারিত হয় , “সস্তা জামার বোতামে দুখিযালি নদী বেঁধে
রাখি । সম্পর্কের কাঁটাতার / পেরিয়ে বটের পাতায় বৃষ্টি ধরে রাখাই আমার
স্বভাব” । / ছুঁতে যাই ছুঁতে যাই কুসুমিত পড়সিবাগান । / ভয় নেই ভয় নেই
ক্যাকটাসও মাটির সন্তান” ।
কবির চোখে সঙ্গম যে ভাবে ফুটে ওঠে,
“গোটা শরীর জুড়ে / মীনকুমারীর কদম ফোটে, নিঃশ্বাস ভারি হয় বাতাসে বাতাসে”।
কিম্বা, “সংসার ও শ্মশানের মাঝে এক ক্লোরোফিল দূরত্ব, ফুঁ দিয়ে তারা সাঁকো
/ তৈরি করে” ।
এক অন্য পূজোর বর্ননায় কবি কন্ঠে ধ্বনিত হয়, “মুঠো
মুঠো ফুল ছুঁড়ে দিচ্ছে ঈশ্বরীর মুখ লক্ষ্য করে । পুষ্ট / টইটুম্বুর স্তন
বেয়ে ঝরে পড়ছে ফুল , শুয়ে থাকা বলিষ্ট অসুরের গায়ে” ।
ভীত হন না কোন
সত্য দৃশ্য চয়নে , তাই তার চোখে এটাও ধরা দেয়, “অনেকখানি নিঃসব হলে
কবিতারা / চুঁইয়ে পড়ে ব্রহ্মহস্ত থেকে ধুলোর কাগজে,” ।
এছাড়া
স্ফুলিঙ্গ থেকে পাওয়া যায়, “চোখের অতলান্ত গভীরে বাদাম রঙের সুবিশাল
দেওয়াল, টাঙানো তাতে / অজস্র মিউরাল, রাজনৈতিক স্লোগান” । আর , “নুনের বাটি
থেকে ছেঁকে তুলি স্নেহরঙের জল । / অসুস্হ কুকুরের মতো ধুঁকতে থাকা শহরের
পোস্টমর্টেম করে পুরুষ্ট ঈশ্বর” । কিম্বা, “বিধর্মী রক্তের নোনা স্রোতে
ভেসে যায় আব্রুহীন দুপুর –বারান্দা “ ।
পিতৃত্বের সংজ্ঞায় জানান দেয় , জন্মাবধি দেখা প্রথম শিল্পী বা অহংকারী ঈশ্বরও বলা যায়” ।
আর যেটা বিশ্বাদের, “গতরাতে ভূগোলের মাস্টার / তার ঠোঁট চটে খেয়েছিল । / আমার একটি মেয়ে ছিল “আলো” / এখন নেই” ।
শীত এলে কবির তুলি আঁচড় দেয়, “টুটাফুটা শীতের একটা পুরুষালি রূপ আছে, ঠিক যেমন ভাব ও / আখরের বানিজ্য করে ফেরা ইনসিকিওরড সওদাগর” ।
কবির
প্রত্নবালিকা যেভাবে সংসারে আবদ্ধ হয়, “একদিন মেয়েটি সংসার মেখেছিল গোটা
গায়ে, স্নেহের সাবান ঘষে ঘষে” । কিম্বা, “প্লেকট্রাম হারিয়ে ফেলা প্রতিটা
বসন্তই আসলে, / পাখি হয়ে উড়ে যায় অন্য আকাশের ছাদে” ।
কবির চোখে
অনুভূতির আরেক ছোঁয়া, “আমিষ কলবরের প্রিয় বুকপকেটে রাখা গুপ্ত কথাদের শুকনো
খোলস / ছাড়ালে, ভেতরে যে তুলতুলে অংশটা / তাকে অনুভূতি বলে, ধিকিধিকি
পুড়তে থাকে । বোকারা তাকে দুই / ঠোঁটের মধ্যবর্তী স্থানে শোয়া নিছক শব্দ
মনে করে” । কিম্বা , ভাঙা পুতুলের মতো আমরা যেমন আদুরে তেমনই ইনসিকিওরড । /
দস্তানার ভিতর বন্দুক নয় আঙুলে পেঁচানো বেলফুলের মালা, জুতোর / মধ্যে
বিস্ফোরক নেই, শুকনো গোলাপ আছে রাখা, পাউরুটির পেটে / বারুদ নয় আলুর
ঝাঁঝালো মশলা ভরা” ।
কবি নগ্ন খিদেকে যে ভাবে তুলে ধরে, “আব্রুহীন
কাঠের গায়ে বাজে কুঠারের নূপুর । / শানিয়ে নেওয়া ঈশ্বরের জিভে জেগে ওঠে
প্রিয় হরিণীর স্বাদ” ।
আর সন্ধানি কবি দু চোখে দেখে কূল না পেলে
উচ্চারন করে, “হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকের খোঁজে যেসব চিঠিরা চুল খুলে দেয়
জানালার গ্রিলে, / তাদের নির্দিষ্ট কোনও ডাকবাক্স থাকে না” । আর পরিনতীতে,
“যৌবন রঙ স্তনে মেখে কুসুমবালা চিলেকোঠার টব থেকে উঠে বাগানের / মাটিতে
বসেছে দু হাত ছড়িয়ে” ।
আর নিরবে বিড়বিড় করে, “আমার শুধু ভেসে যাওয়াটুকু
আছে, ফেরার ঠিকানা হারিয়েছি বহু আগে” । তবুও মায়া জন্মায়, প্রাক্তন
প্রেমিকের তরে, “শিকারী আলোর হলদে জানালার নীচে এক কৃষ্ণকায় হৃষ্টপুষ্ট
পুরুষ লাল / নীল সবুজ চুড়ি বিক্রি করে । তার ইস্পাত কঠিন বুক থেকে ছিটকে /
আসে ছাতিম ফুলের নরম ঘ্রাণ । / ভীষন ইচ্ছে হয় কোনও এক গ্রীষ্মের দুপুরে,
পিঁড়ি পেতে শাকান্ন রেঁধে / তাকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে” ।
অতীতটা বারবার হানা দেয়, “কথা ছিল পার্সিয়ান ব্ল্যু হয়ে একে অপরের দেওয়ালে লেপটে থাকার” ।
প্রতিটা
প্রেম, প্রেমিক, প্রেমিকা যেমনটি হয়, “সে একাধারে আমার মেয়ে, স্ত্রী, মা,
আমার প্রেমিকাও বটে, ও / আমার সরসীবালা । বল্কল ত্যাগ করে কিরাতের মতো ফিরে
আসি ময়লা / কুঠিরে” । তাই, “এক একটা মুহূর্ত দীর্ঘ হয়ে আসে যেমন সন্তান
প্রসবের আগের / রাত” । কিম্বা, “কফির টেবিলে আমরা সমুদ্র আঁকি, অথচ
বহ্নিপাঁজরে যে / স্বচ্ছতোয়া নদী কলকল করে বয়ে যায় আব্রুহীন কাঁটাতার
ছুঁয়ে, তার / খোঁজ কি কেউ রাখে ?”
বাজে অবক্ষয়ের বাজনা, “নিখোঁজ
হওয়ার আগে প্রতিটা চিঠির ঠোঁট থেকে মুছে যায় / প্রেমিকের ঘ্রাণ । রোদ গিলে
খাওয়া লেপের রোঁয়ায় জলের যে দাগ লেগে / থাকে তা আসলে একপ্রকার অবক্ষয়” ।
বাঁচার
আহ্বান যেভাবে ধরা দেয়, “সোনালি ধানক্ষেতের পাশে শোয়া ছাইরঙা খাল, উপর
দিয়ে বয়ে চলে / সন্ন্যাসী হাওয়া” । কিম্বা, “আসলে মা বুঝিয়ে দিয়েছে কেমন
করে মানিয়ে নিতে হয়, আধসিদ্ধ / ডিমের নরম কুসুমের মতো” । তাই কবি যেভাবে
ধরা দেয়, “ অনেকখানি ক্লান্ত হলে প্রিয় কবিতার কাছে নগ্ন হই” । আর আহ্বান
করেন, “এসো আগুন এসো ছুঁইয়ে দাও তোমার প্রসাদী ফুল আমার কপালে” ।
ইন্দ্রিয়কে
সজাগ করতে কবি লিখে ফেলেন, “ এই যে ব্লেডরঙের আকাশ প্রতিদিন একটা করে
বিধবা চাঁদ চিরে ফেলে / কখনও তার নিরীহ শীৎকার শুনেছেন ? / পা বেয়ে চুঁইয়ে
পড়ে রজঃস্রাবের লাল, অথচ গোটা শরীর মন জুড়ে / মেয়েটিকে বন্ধ্যা হতে
দেখেছেন ?”
সম্পর্কে তিনি দেখেন, “ওর ভিজে সপসপে গা বেয়ে / গড়িয়ে
পড়ে বীজভাঙা নোনা পানি । আমি মুখ ডুবিয়ে টাটকা মাছের গন্ধ / শুঁকি” ।
সঙ্গমি নারি কন্ঠে তুলে দেন যে বানী, “বৈধতার বল্কল খসিয়ে পারদের মতো
ওঠানামা করি ওর জিভের / গভীরে” । কিম্বা, “নারীজন্মের সমস্ত গোপন কথার
পান্ডুলিপি ফাঁস হয়ে / যাক ওর সম্মুখে । ঈশ্বরের বর্ম ভেদ করে প্রকৃত
প্রেমিক হয়ে উঠুক” ।
এত সম্ভবনা কি হেলায় ফেলবার , হে নবীন কবিদল,
পাঠক সমাজ ? কবি কৃপা বসুর “ দ্রাঘিমা ও প্রত্নবালিকা” ঠাঁই পাক সেইসব
বোদ্ধা মননশীল কবি পাঠকের হাতের তালুমুদ্রায় । নিরীহ আমি তো দেখলাম, এবার
আপনার পালা ।
* গ্রন্থ দৃষ্টিপাতে = বিষফল
- গ্রন্থ মূল্যায়ন -















